যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি বাজারে চীনা প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রবেশ নিয়ে ফোর্ড ও চীনা গাড়ি নির্মাতা গিলির মধ্যে আলোচনা চলেছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই আলোচনা থমকে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। দুই পক্ষ এখন মূলত ইউরোপে প্রযুক্তি ভাগাভাগি ও উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহারের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে এগোচ্ছে।
গিলি চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা। বিওয়াইডির পর দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে গিলি বৈশ্বিক বাজারে আরও বড় উপস্থিতি চায়। যুক্তরাষ্ট্র তার জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি বাজার এবং লাভজনকও। কিন্তু এই বাজারে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের প্রবেশ কার্যত বন্ধ। উচ্চ শুল্ক, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সংযুক্ত গাড়ির চীনা সফটওয়্যার নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে পথটি অত্যন্ত কঠিন।
আলোচনার একটি পর্যায়ে ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে গিলির প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছিল। এমনকি ভবিষ্যৎ মডেলের জন্য গিলির গাড়ি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কথাও আলোচনায় আসে। গাড়ি প্ল্যাটফর্ম বলতে এমন একটি কাঠামোগত ভিত্তিকে বোঝায়, যার ওপর ভিন্ন ভিন্ন মডেলের গাড়ি তৈরি করা যায়। তবে এই সম্ভাবনা এখন আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।

চীনা প্রযুক্তি নিয়ে দ্বিধায় ফোর্ড
ফোর্ডের অবস্থান এখন অনেক বেশি সতর্ক। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জিম ফারলি সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে চীনা তৈরি গাড়ি ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়, অন্তত চাকরি সুরক্ষার একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা না থাকা পর্যন্ত। ফোর্ডের একজন মুখপাত্রও বলেছেন, কোম্পানি নিজেদের ঘরের বাজার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার ভাষায়, চীনা কোনো গাড়ি নির্মাতাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের পথ করে দেয় এমন চুক্তি ফোর্ডের সেই অবস্থানের বিপরীত হবে।
গিলির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অন্য গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে তারা সব সময় খোলা মন রাখে। তবে সম্ভাব্য অংশীদারত্ব নিয়ে গুজব বা অনুমান সম্পর্কে তারা মন্তব্য করে না।
যুক্তরাষ্ট্রে চীনা গাড়ি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ শুধু ব্যবসায়িক নয়, কৌশলগতও। দেশটির গাড়ি নির্মাতারা মনে করে, চীনা ব্র্যান্ডগুলো তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। তারা ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসের কাছে চীনা কোম্পানিগুলোকে বাজারের বাইরে রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। কারণ তাদের দাবি, চীনা নির্মাতারা কম উৎপাদন খরচ, উন্নত প্রযুক্তি এবং সরকারি ভর্তুকির সুবিধা নিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, চীনা তৈরি গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক বজায় রাখা জো বাইডেনের কয়েকটি ভালো সিদ্ধান্তের একটি। তবে জানুয়ারিতে ডেট্রয়েটে তিনি আবার বলেছিলেন, চীনা গাড়ি যদি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়, তাহলে তিনি সেগুলোর ব্যাপারে খোলা মন রাখতে পারেন। এই বক্তব্য তার আগের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
ইউরোপে চুক্তির সম্ভাবনা বেশি
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ঝুঁকি বড় হলেও ইউরোপে ফোর্ড ও গিলির আলোচনা বেশি বাস্তবসম্মত অবস্থায় আছে। ইউরোপে চীনা গাড়ি দ্রুত বাজার দখল করছে। গিলি সেখানে শুল্কের চাপ কমাতে স্থানীয় উৎপাদন সুবিধা ব্যবহার করতে চায়। আলোচনায় স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার কাছে ফোর্ডের কারখানা ব্যবহারের বিষয় এসেছে। এতে গিলি ইউরোপে উচ্চ শুল্ক এড়াতে পারে, আর ফোর্ড নিজের অব্যবহৃত উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে।
গিলির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আরেকটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে তার মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত ব্র্যান্ডগুলোর মাধ্যমে। কোম্পানিটি সুইডিশ ব্র্যান্ড ভলভো ও পোলস্টারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে, যেগুলো ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি বিক্রি করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গিলি তার আরও কিছু ব্র্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রে আনতে আগ্রহী।

তবে ফোর্ডের জন্য চীনা অংশীদারিত্ব নতুন বিতর্কের কারণ হতে পারে। কোম্পানিটি ইতিমধ্যে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি নির্মাতা কনটেম্পোরারি অ্যাম্পেরেক্স টেকনোলজির প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিশিগানে ৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যাটারি কারখানা গড়ার পরিকল্পনা করছে। এই চুক্তি নিয়েও মার্কিন আইনপ্রণেতা ও কর্মকর্তাদের সমালোচনার মুখে পড়েছে ফোর্ড।
চীনা গাড়ি নির্মাতারা এখন বিশ্ববাজারে সাশ্রয়ী, প্রযুক্তিনির্ভর ও আকর্ষণীয় বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং হাইব্রিড মডেল নিয়ে দ্রুত এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে কার্যরত মার্কিন, এশীয় ও ইউরোপীয় নির্মাতারা বলছে, তারা চীনের কম খরচের উৎপাদন ও সরকারি সহায়তাপুষ্ট প্রযুক্তির সঙ্গে সহজে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না।
এই বাস্তবতায় ফোর্ড ও গিলির সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা শুধু একটি ব্যবসায়িক চুক্তি হতো না। এটি হয়ে উঠত মার্কিন শিল্পনীতি, চাকরি সুরক্ষা, প্রযুক্তি নিরাপত্তা এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। আপাতত সেই দরজা বন্ধ না হলেও, পথটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সংকীর্ণ।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















