যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে, তখন তিনি শুধু সামরিক অবস্থানেই থেমে থাকেননি; বরং ইরানের জনগণকে সরাসরি বিদ্রোহে নামার আহ্বানও জানান। ২৮ ফেব্রুয়ারি দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “যখন আমরা শেষ করব, তখন আপনারাই সরকার দখল করুন—এটাই হয়তো প্রজন্মের মধ্যে আপনাদের একমাত্র সুযোগ।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কার্যত ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার আহ্বানই জানাচ্ছিলেন।
কিন্তু এই অবস্থান খুব দ্রুতই পরিবর্তিত হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অবস্থান নরম করে। ২ মার্চ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্টভাবে জানান, এটি কোনো ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধ নয়। একই সুরে কথা বলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা মূল লক্ষ্য নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো নিশ্চিত করা যে ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে না পারে।
পরিস্থিতি আরও এক ধাপ এগোয় যখন ট্রাম্প দাবি করতে শুরু করেন যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের হত্যা করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের হুমকি অনেকটাই কমিয়ে এনেছে। এমনকি এপ্রিলের মাঝামাঝি তিনি মন্তব্য করেন, “তাদের নতুন নেতৃত্ব এসেছে, এবং আমরা তাদের যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করি।”
কিন্তু বাস্তব বিশ্লেষণ বলছে, এই ধারণা ভুলের কাছাকাছি। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র বোমা হামলা চালিয়ে কোনো সরকারকে উৎখাত করা অত্যন্ত কঠিন—অনেক ক্ষেত্রে প্রায় অসম্ভব। বাস্তব অভিজ্ঞতাও এই ধারণাকে সমর্থন করে। লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল বা ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে সরানোর পর যে দীর্ঘ সহিংসতা চলেছিল, তা দেখিয়েছে—শাসন পরিবর্তন সবসময় স্থিতিশীলতা আনে না; বরং অনেক সময় আরও গভীর সংকট তৈরি করে।

নতুন নেতৃত্ব, পুরোনো কৌশল
ইরানে এখন নতুন নেতৃত্ব এলেও তাদের চিন্তাভাবনা বা নীতিগত অবস্থানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির প্রভাব আগের চেয়েও বেশি দৃঢ় হয়েছে। বর্তমানে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্র কার্যত এই সামরিক-নিরাপত্তা কাঠামোর হাতে কেন্দ্রীভূত।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি—যিনি আলি খামেনির ছেলে—একটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। ফলে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় কারণেই তাঁর নেতৃত্ব আরও কঠোর এবং প্রতিরোধমুখী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
আইআরজিসির শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে এই শাসনব্যবস্থার প্রতি অনুগত। নতুন প্রধান আহমদ বাহিদি পূর্বে কুদস ফোর্সের দায়িত্বে ছিলেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেসে ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে হামলার পরিকল্পনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে, যেখানে ৮৫ জন নিহত হয়।
এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহাম্মদ কালীবাফ—দুজনেই আইআরজিসির পটভূমি থেকে উঠে এসেছেন। তাদের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মৌলিক লক্ষ্য এক—যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিহত করা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা।
এ কারণে তেহরান এখনো প্রকাশ্যে বলছে যে, প্রয়োজন হলে তারা শক্তি প্রয়োগ করে অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ দমন করবে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এসব বক্তব্য স্পষ্ট করে যে, নতুন নেতৃত্ব কোনোভাবেই নরম অবস্থানে যাচ্ছে না।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চাপ
তবে নতুন নেতৃত্ব আগের চ্যালেঞ্জগুলোকেও উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। কয়েক মাস আগেও লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিল অর্থনৈতিক দুরবস্থা, দুর্নীতি এবং জনসেবার অভাবের প্রতিবাদে। গত পাঁচ বছরে এই ধরনের আন্দোলনের সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়েছে।
বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ও অপূর্ণ প্রত্যাশা একটি বড় চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এই সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করতে পারছে না।
যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সরকার জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়ে জনগণকে একত্র করার চেষ্টা করেছে—যেমনটি তারা অতীতেও করেছে। কিন্তু এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা থেকে যায়।
উল্টো যুদ্ধ শেষ হলে সমস্যাগুলো আরও বাড়তে পারে। পুনর্গঠনের নামে আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করবে, নাকি সামাজিক সেবা উন্নত করবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামরিক খাতই অগ্রাধিকার পায়, ফলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

ছোট সমঝোতার বাস্তবতা
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—তারা কী করবে? আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করা হলে আইআরজিসির অভ্যন্তরীণ শক্তি কমবে না; বরং তারা আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, দ্রুত একটি বড় ও ব্যাপক শান্তি চুক্তি করাও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে ইরানের ওপর থেকে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে অর্থনীতিতে বিপুল অর্থ প্রবাহিত হবে, যা আইআরজিসিকে আরও শক্তিশালী করবে। এতে জনগণের চাপ কমে গিয়ে বর্তমান শাসনব্যবস্থা নতুন করে স্থিতিশীলতা পেতে পারে।
এই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সীমিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা—যেমন হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং ইরানের পক্ষ থেকে আঞ্চলিক হামলা বন্ধ করা নিশ্চিত করা। এই ধরনের ছোট চুক্তি হয়তো সব সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বড় চুক্তির শিক্ষা
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ ইরানকে কিছু অর্থনৈতিক স্বস্তি দিয়েছিল, তবে আইআরজিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। ফলে তারা পুরো অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। বরং তখন ইরানের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছিল—আইআরজিসির ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত।
কিন্তু পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে গেলে এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে আইআরজিসি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে তাদের ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।
আজকের ইরান তাই ২০১৫ সালের ইরানের মতো নয়। এখন ক্ষমতার কেন্দ্র আরও বেশি সামরিকীকৃত, আর জনগণের অসন্তোষও অনেক বেশি তীব্র।
চাপ ও ভবিষ্যৎ
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে—যুদ্ধ বন্ধ রাখা, কিন্তু চাপ অব্যাহত রাখা। এমন কোনো চুক্তি করা উচিত নয়, যা ইরানের বর্তমান কঠোর নেতৃত্বকে নতুন করে শক্তি জোগায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত সেখানকার জনগণের হাতেই থাকা উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা যে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলেছে, তা প্রমাণ করে যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ভেতর থেকেই আসতে পারে।
সুতরাং আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ—এই দুইয়ের সমন্বয়ই হয়তো ভবিষ্যতে ইরানের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে।
রিচার্ড নেফিউ 


















