কলকাতার শতবর্ষী সেন্ট লরেন্স স্কুলে শেষ মুহূর্তের নির্দেশনা দিতে মাইকে ঘোষণা চলছে। কাছাকাছি বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে আসা ভোটকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীরা সেখানে জড়ো হয়েছেন। রিচি রোডের এক পাশে সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে আছে—যেগুলো ভোটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কেন্দ্রে নিয়ে যাবে। দক্ষিণবঙ্গের নানা জায়গায় একই দৃশ্য—শেষ দফার ভোটকে ঘিরে প্রস্তুতি তুঙ্গে।
বুধবার ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় ও শেষ দফায় ভোট হচ্ছে ১৪২টি আসনে। দক্ষিণবঙ্গের এই অঞ্চল—কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদিয়ার অংশবিশেষ—রাজ্যের রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত কেন্দ্র। বিশ্লেষকদের মতে, এই দফাই পুরো নির্বাচনের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণবঙ্গ রাজ্যের মোট ভূমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হলেও এখানে বসবাস করে প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা। উর্বর পলিমাটি, বন্দর সুবিধা এবং শিল্পাঞ্চলের কারণে এই অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের নির্বাচনে এখানেই তৃণমূল কংগ্রেস সবচেয়ে ভালো ফল করেছিল—১২৩টি আসন জিতেছিল, যেখানে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ১৮টি।
এই কারণে দক্ষিণবঙ্গের সমতলভূমিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। তৃণমূল নিজেদের ঘাঁটি ধরে রাখতে মরিয়া, অন্যদিকে বিজেপি আক্রমণাত্মক প্রচারে নেমেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বহু সদস্য এবং বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা প্রায় প্রতিদিনই প্রচারে অংশ নিয়েছেন।
এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। তাদের সঙ্গে মুসলিমদেরও নাম বাদ পড়ার অভিযোগ রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়, যা ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দক্ষিণবঙ্গ একইসঙ্গে শিল্পহীনতার ধাক্কাও সবচেয়ে বেশি সহ্য করেছে। কর্মসংস্থানের অভাবে বহু মানুষ রাজ্যের বাইরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১১ সালের জনগণনায় দেখা যায়, প্রায় ৫.৮ লাখ মানুষ কাজের খোঁজে অন্য রাজ্যে গেছেন। বর্তমানে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
নির্বাচন ঘিরে দেখা যাচ্ছে, বহু অভিবাসী শ্রমিক ট্রেন, বাস ও বিমানে করে বাড়ি ফিরছেন ভোট দিতে। তাদের ভোটের গুরুত্ব বুঝে রাজনৈতিক দলগুলোও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। বাম দলগুলো রেলস্টেশনগুলোতে কর্মী মোতায়েন করে এই শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। একই সঙ্গে তৃণমূল ও বিজেপিও পরিবারগুলোকে তাদের সদস্যদের বাড়ি ফিরিয়ে আনতে উদ্বুদ্ধ করছে।
অন্যদিকে, প্রথম দফায় ভোট হয়েছে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের ১৫২টি আসনে—যেখানে তৃণমূলের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার মতো এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং ২০২১ সালে সেখানে বিজেপির প্রভাব বাড়ে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। তৃণমূল ৪২টির মধ্যে ২৯টি আসন জিতে দক্ষিণবঙ্গে প্রাধান্য বজায় রাখে, অন্যদিকে বিজেপির শক্তি মূলত উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে।
দুর্নীতি, শিল্পক্ষয়ের ইতিহাস এবং কর্মসংস্থানের জন্য রাজ্যের বাইরে যেতে বাধ্য হওয়ার বাস্তবতা—এই সব বিষয় বিজেপির পক্ষে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে শাসকবিরোধী মনোভাব কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধারণত ধীরে ঘটে। বামফ্রন্ট টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল, তার আগে কংগ্রেস প্রায় তিন দশক শাসন করেছে। বর্তমানে তৃতীয় মেয়াদে থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে বড় প্রশ্ন—এই নির্বাচনে কি সত্যিই পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলবে?
সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় ও শেষ দফার এই ভোটই পুরো নির্বাচনের ফল নির্ধারণে চূড়ান্ত ভূমিকা নেবে। এর মাধ্যমে শুধু সরকারই নয়, আগামী পাঁচ বছরের জন্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দিকনির্দেশও ঠিক হয়ে যাবে।
জয়ন্ত রায় চৌধুরী 



















