আমি আইবিএসে আক্রান্ত—অনেকেই মনে করেন, এই রোগের আসল কারণ কেউ জানে না। অনলাইনে নানা পরামর্শ দেখা যায়, যেমন পেট ম্যাসাজ—এসব কি আদৌ কাজ করে?
একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট হিসেবে আমি যে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা দেখি, তা হলো মানুষ মনে করে আইবিএসের আসল সমস্যাটা আমরা জানি না। দ্বিতীয় ভুল ধারণা—এর কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।
সম্প্রতি আইবিএস নিয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ১৩০টির বেশি ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ২০ শতাংশ তৈরি করেছেন স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীরা। বাকি ভিডিওগুলোতে চা, ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা, প্রোবায়োটিক বা পেট ম্যাসাজের মতো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এগুলোর অনেকগুলোরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অথচ আইবিএস একটি জটিল রোগ, যার অন্ত্রের ভেতরে কোষ ও স্নায়ুর স্তরে সুস্পষ্ট পরিবর্তন ঘটে—এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়।
অনেকেই এসব পরামর্শে ভরসা করেন কারণ তারা শুনেছেন—আইবিএসের কিছু করার নেই। অথচ বহু বছরের গবেষণা ও চিকিৎসা পরীক্ষায় প্রমাণিত, এর কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে।
আইবিএস কী এবং শরীরে কী ঘটে
আমাদের অন্ত্রে প্রায় ৫০ কোটি স্নায়ুকোষ রয়েছে, যাকে এন্টারিক নার্ভাস সিস্টেম বলা হয়। আইবিএসে এই স্নায়ুগুলোর কার্যক্রমে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। কিন্তু সাধারণ পরীক্ষায় যেমন কোলনোস্কপি বা রক্তপরীক্ষায় কিছু ধরা পড়ে না, ফলে অনেকেই মনে করেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু পরীক্ষায় স্বাভাবিক ফল মানেই অন্ত্র স্বাভাবিক নয়। অন্ত্রের গভীর স্তরের স্নায়ুগুলো এসব পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। আইবিএসে এই স্নায়ুগুলো অতিসংবেদনশীল হয়ে যায়, ফলে সাধারণ গ্যাস বা খাবারের চাপও ব্যথা তৈরি করে। এছাড়া মাষ্ট সেল নামে কিছু কোষ প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং অন্ত্রের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনে। মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং অন্ত্রের চলাচলেও সমস্যা দেখা দেয়—কখনো ডায়রিয়া, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য।

অনেকে মনে করেন এটি শুধু মানসিক চাপের কারণে হয়। যদিও চাপ উপসর্গ বাড়াতে পারে, তবে অন্ত্রের সমস্যাই অনেক সময় উদ্বেগ ও বিষণ্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কী করলে উপকার পাওয়া যায়
আইবিএসের মূল উপসর্গ হলো ব্যথা ও অস্বস্তি। তাই চিকিৎসা লক্ষ্য থাকে স্নায়ুর সংবেদনশীলতা কমানো এবং অন্ত্রের চলাচল স্বাভাবিক করা।
প্রথম ধাপে দ্রবণীয় আঁশ বা ফাইবার, যেমন সাইলিয়াম হস্ক, উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে এটি উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে। তবে অদ্রবণীয় আঁশ অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়াতে পারে। ফাইবার ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানি খেতে হবে।
খাদ্য নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কম ফারমেন্টেবল কার্বোহাইড্রেটযুক্ত ডায়েট অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে সব খাবার বাদ দেওয়া নয়—যেগুলো সমস্যা বাড়ায় শুধু সেগুলো চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলাই লক্ষ্য।
পুদিনা বা পেপারমিন্ট অন্ত্রের পেশি শিথিল করতে সাহায্য করে। গবেষণায় এর উপকারিতা পাওয়া গেছে, বিশেষ করে ক্যাপসুল আকারে। নিয়মিত ব্যায়াম এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়াও উপকারী।
কী কাজ করে না
প্রোবায়োটিক নিয়ে ব্যাপক প্রচার থাকলেও আইবিএসের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত নয়। একইভাবে পেট ম্যাসাজ কিছু ক্ষেত্রে সামান্য উপকার দিতে পারে, তবে এটি প্রধান চিকিৎসা নয়।
প্রয়োজনে ওষুধ
যদি এসব পদ্ধতিতে কাজ না হয়, তবে প্রেসক্রিপশন ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান হলে কিছু ওষুধ অন্ত্রে পানি বাড়িয়ে মলত্যাগ সহজ করে। ডায়রিয়া প্রধান হলে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধও দেওয়া হয়, যা অন্ত্রের স্নায়ুর সংকেত নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
রোগীদের জন্য বার্তা
অনেক কোম্পানি ঘরে বসে অন্ত্রের সমস্যা শনাক্তের নামে ব্যয়বহুল পরীক্ষা বিক্রি করে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। এসব থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
আইবিএস একটি বাস্তব, সাধারণ এবং চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সঠিক চিকিৎসার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কেউই এই সমস্যায় একা ভুগতে বাধ্য নন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















