চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেটার অধিগ্রহণ করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি ম্যানুস এআই-এর চুক্তি তারা নিষিদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এআই প্রতিভা ও সম্পদের প্রবাহ ঠেকাতে বেইজিংয়ের এটাই সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ, যা জটিল আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাতের সূচনা করতে পারে।
ম্যানুস এআই, যা উহানের চীনা প্রকৌশলীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পরে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তরিত হয় এবং গত ডিসেম্বরে মেটা প্রায় ২০০ কোটি ডলারে এটি অধিগ্রহণ করে। জানুয়ারিতে চীনা কর্তৃপক্ষ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ মেনে চলার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে এবং কয়েক সপ্তাহ আগে কোম্পানির দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে দেশ ছাড়তে বাধা দেয়।
সোমবার চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন এক বিবৃতিতে জানায়, তারা “ম্যানুস প্রকল্পের বিদেশি অধিগ্রহণ নিষিদ্ধ” করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এই চুক্তি বাতিল করতে হবে।
এই সিদ্ধান্ত চীনের সেই প্রচেষ্টার বড় অগ্রগতি, যেখানে তারা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এর ফলে এশিয়ার এআই খাতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
এই পদক্ষেপ এমন এক সময় নেওয়া হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এআই ইস্যুতে উত্তপ্ত। এ সপ্তাহেই হোয়াইট হাউস অভিযোগ করেছে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পিতভাবে মার্কিন এআই মডেল থেকে সক্ষমতা সংগ্রহ করছে।
আগামী মাসে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এআইসহ নানা বিষয় আলোচনায় আসবে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, কয়েক মাস আগে সম্পন্ন হওয়া এই অধিগ্রহণ বাতিল করার ক্ষেত্রে চীনের আইনি এখতিয়ার কতটা কার্যকর হবে। ম্যানুস ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত এবং তাদের চীনা কার্যক্রম বন্ধ করেছে। অধিকাংশ কর্মী এখন সিঙ্গাপুরে মেটার দপ্তরে কাজ করছেন।
ম্যানুস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। মেটার মুখপাত্র অ্যান্ডি স্টোন বলেছেন, “এই লেনদেন সম্পূর্ণ আইন মেনে সম্পন্ন হয়েছে।”
সিঙ্গাপুরের ডিজিটাল উন্নয়ন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য দেয়নি।
চীনের নেতারা এখন “চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া” প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন—যেখানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পুঁজি ও সুযোগের জন্য সম্পর্ক ছিন্ন করে। ম্যানুস ছাড়াও, মিরোমাইন্ড নামের আরেকটি চীনা এআই কোম্পানিকে একই ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, ম্যানুস ঘটনাই তার প্রথম বড় পরীক্ষা।
প্রযুক্তি নীতিবিষয়ক গবেষক কেন্দ্রা শেফার বলেন, এখনো স্পষ্ট নয়, চীন কীভাবে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের ওপর বিদেশে থেকেও কর্তৃত্ব দাবি করবে।
তবে আইনি ভিত্তি দুর্বল হলেও, চীনের হাতে চাপ প্রয়োগের শক্তি রয়েছে। ম্যানুসের প্রধান নির্বাহী শাও হং ও প্রধান বিজ্ঞানী জি ইচাও এখনো চীনে অবস্থান করছেন এবং তাদের দেশ ছাড়তে দেওয়া হয়নি।
একজন বিশ্লেষক বলেন, “যদি রাষ্ট্র পরিবারকে হুমকি দেয়, তখন আইনের চেয়ে বাস্তবতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা চীনা উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। মেটার পক্ষেও এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে, এবং বিষয়টি রাজনৈতিক পর্যায়ে সমাধান করতে হতে পারে।
সম্প্রতি পর্যন্ত অনেকেই ধারণা করেছিলেন, চীন এতদূর যাবে না। কিন্তু এক সাবেক ম্যানুস প্রকৌশলী বলেন, “এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। এটি হয়তো বৃহত্তর দমন-পীড়নের সূচনা।”
অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ম্যানুস এমন কোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি তৈরি করে না, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। প্রতিষ্ঠানটি বড় ভাষা মডেলের ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে এমন সফটওয়্যার তৈরি করে।
তবুও, এই সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যাচ্ছে, চীনে এআইকে এখন শুধু বাণিজ্যিক প্রযুক্তি নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে দেশটির এআই খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















