পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যার দিকে এগোচ্ছে, আর এই পরিবর্তনের মাঝেই এক নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বৃদ্ধরাই হয়ে উঠছেন শ্রমবাজারের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন অনেক প্রবীণ মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, বরং সক্রিয় ও সুস্থ থাকার লক্ষ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন।
বয়স বাড়লেও থেমে নেই কাজ
জাপানের এক ৯৩ বছর বয়সী নারী এখনও নিয়মিত কাজ করছেন। তার মতে, মানুষকে চলতেই হবে, নাহলে শরীর-মন দুটোই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই মনোভাব এখন আর ব্যতিক্রম নয়। বরং দীর্ঘায়ু এবং তুলনামূলক ভালো স্বাস্থ্যের কারণে অনেকেই অবসর বয়স পার করেও কর্মজীবনে থাকছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং জাপানে ২৫ শতাংশের বেশি এখনও কাজ করছেন। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে এটি সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি।
কাজের পেছনে অর্থনৈতিক চাপ
তবে সবাই একই কারণে কাজ করছেন না। অনেকের জন্য এটি প্রয়োজনের বিষয়। জাপানে অর্ধেকের বেশি প্রবীণ কর্মী জানিয়েছেন, তারা আয় করার জন্য কাজ করেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন। সেখানে পেনশন ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেক প্রবীণই পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা পান না।
ফলে অবসর নেওয়ার পরও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। অনেকেই আশঙ্কা করেন, খুব তাড়াতাড়ি অবসর নিতে বাধ্য করা হলে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে।
মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য কাজ
অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও কাজের রয়েছে অন্য গুরুত্ব। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বয়স্ক বয়সেও কাজ করেন, তারা তুলনামূলকভাবে কম অসুস্থ হন এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকেন। একাকীত্বও কম থাকে।
অনেকেই মনে করেন, কাজ না করলে তারা পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে পড়বেন। তাই কাজ তাদের জন্য আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার প্রতীক।

কর্মক্ষেত্রে বাধা ও বৈষম্য
তবে এই প্রবণতার মাঝেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোনো কাঠামোতে আটকে আছে, যেখানে বয়সভিত্তিক বেতন ও পদোন্নতি ব্যবস্থা চালু। ফলে প্রবীণ কর্মীদের পূর্ণকালীনভাবে রাখা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে অবসর নেওয়ার পর আবার কম বেতনে অস্থায়ী কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন চাকরি খুঁজতে গেলে বয়সের কারণে বৈষম্যের মুখেও পড়তে হয়।
দক্ষতা ও কাজের অমিল
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দক্ষতার সঙ্গে কাজের অমিল। অনেক প্রবীণ কর্মীর অভিজ্ঞতা থাকলেও বাজারে তাদের উপযোগী কাজ কম। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী বা স্বল্পদক্ষতার কাজে যুক্ত হন।
সরকারি উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারগুলো নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবীণদের জন্য লাখ লাখ খণ্ডকালীন কাজ তৈরি করা হয়েছে। জাপানে রয়েছে বিশেষ কেন্দ্র, যেখানে বয়স্কদের কাজ খুঁজে পেতে সহায়তা করা হয়।
একই সঙ্গে অবসর বয়স বাড়ানো ও কর্মজীবন দীর্ঘ করার নীতিও গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে কমে আসা তরুণ শ্রমশক্তির ঘাটতি কিছুটা পূরণ হচ্ছে।
নতুন করে ভাবতে হবে কর্মজীবন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মজীবনের শেষ সময়কে নতুনভাবে ভাবতে হবে। ৬৫ বছর পেরোনোর পর জীবন শেষ নয়, বরং এটি নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ হতে পারে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমবাজার ও সামাজিক ব্যবস্থাকেও বদলাতে হবে। না হলে বিশাল একটি দক্ষ জনশক্তি অব্যবহৃতই থেকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















