দক্ষিণ থেকে উত্তর—পুরো দেশকে এক সুতোয় গাঁথতে চায় ভিয়েতনাম। প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উচ্চগতির রেলপথের স্বপ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রেল চালু হলে হো চি মিন সিটি থেকে রাজধানী হ্যানয় যেতে সময় লাগবে মাত্র ছয় ঘণ্টা, যেখানে এখন লাগে প্রায় ৩৫ ঘণ্টা। তবে স্বপ্ন যত বড়, প্রশ্নও ততই গভীর—এত বিপুল অর্থ আসবে কোথা থেকে?
স্বপ্নের সূচনা ও ফিরে আসা
২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো এই উচ্চগতির রেল প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তখনকার অর্থনৈতিক অবস্থায় এর ব্যয় ছিল দেশের মোট অর্থনীতির অর্ধেকেরও বেশি, যা শেষ পর্যন্ত সংসদে আটকে যায়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর, শক্তিশালী অর্থনীতি নিয়ে আবার সেই পরিকল্পনায় ফিরেছে দেশটি। এখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান অর্থনীতির প্রায় ১৪ শতাংশ।

অর্থের জোগান নিয়ে অনিশ্চয়তা
সরকার বলছে, বছরের শেষ নাগাদ নির্মাণ শুরু হবে। কিন্তু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই বিপুল অর্থ জোগাড় করা কীভাবে সম্ভব? উচ্চগতির রেল প্রকল্পগুলো বিশ্বজুড়েই ব্যয় বাড়া, দেরি এবং বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার জন্য পরিচিত। ফলে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও আশঙ্কা কম নয়।
চীনের ছায়া ও সতর্কতা
এশিয়ার অনেক দেশ এমন প্রকল্পে চীনের সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে। কারণ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সফল উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে চীন। কিন্তু ভিয়েতনাম এই পথে হাঁটতে চায় না। দীর্ঘ ইতিহাস ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে চীনের প্রভাব নিয়ে দেশটি সতর্ক। পাশাপাশি, ইন্দোনেশিয়ায় চীনের সহায়তায় নির্মিত রেলপথ চালুর পর ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও ভিয়েতনামকে ভাবাচ্ছে।
বেসরকারি বিনিয়োগের আশা

সরকার এখন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ধারণা, এতে দুর্নীতি ও অদক্ষতা কমবে। তবে এত বড় প্রকল্পে আগ্রহ দেখানো বিনিয়োগকারী এখনো সামনে আসেনি। এক সময় একটি বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠান খরচের ২০ শতাংশ বহনের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু পরে তারা সরে দাঁড়ায়। ফলে প্রকল্পটি আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
বাস্তবতা বনাম উচ্চাভিলাষ
অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে এগোনোর পরামর্শ দিচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের একটি অংশ—হো চি মিন সিটি থেকে উপকূলীয় শহর ন্যা ট্রাং পর্যন্ত অংশ—প্রথমে নির্মাণ করলে সেটি লাভজনক হতে পারে।
ভবিষ্যতের দোলাচল
উচ্চগতির রেল ভিয়েতনামের অর্থনীতিকে গতি দিতে পারে, উন্নয়নকে ছড়িয়ে দিতে পারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে অর্থের জোগান, বিনিয়োগকারীর অভাব এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের বাস্তবতা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















