দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছালেও পরীক্ষার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। রাজধানীর মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একমাত্র পরীক্ষাগারে এখন হাম পরীক্ষার কিট আছে মাত্র সাতটি। এসব কিট দিয়ে সর্বোচ্চ ৬৩০টি রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। বর্তমান হারে পরীক্ষা চলতে থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই মজুত শেষ হয়ে যাবে। নতুন কিট না এলে ১১ মের পর দেশে হাম পরীক্ষার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, গত এপ্রিল থেকেই কিট সংকট প্রকট হতে শুরু করেছিল। তবে জরুরি ভিত্তিতে নতুন কিট সংগ্রহে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন সারা দেশ থেকে গড়ে ৩০০ রোগীর নমুনা পরীক্ষার জন্য আসে। এরই মধ্যে পরীক্ষার অপেক্ষায় জমে আছে ৭ হাজার ৭৫৮টি নমুনা।
সংক্রমণ বাড়লেও পরীক্ষায় সীমাবদ্ধতা
গত ১৫ মার্চ থেকে গত সোমবার পর্যন্ত দেশে মোট ১৬ হাজার ৫২৭টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে ৮ হাজার ৭৬৯টি নমুনার। পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ৩ হাজার ৭১৪টিতে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা মোট পরীক্ষার ৪২ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, হাম পরীক্ষার কিট সরবরাহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একটি কিট দিয়ে ৯০ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা যায়। পরীক্ষাগারের দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০টি নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও কিট সংকটের কারণে সেই সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান বলেন, এক মাস আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে নতুন কিটের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছিল। তবে এখনো তা এসে পৌঁছায়নি। তাঁর আশা, ১৫ মে নাগাদ নতুন কিট পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে হাতে থাকা কিট দিয়ে আর চার থেকে পাঁচ দিন পরীক্ষা চালানো সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেছেন, এটি স্পষ্ট অবহেলার ফল এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, কিট সংকটে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হবে না। এতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি দ্রুত রোগ শনাক্ত, আইসোলেশন ও রোগী ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, সংসদে আলোচনা এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন।

শিশুদের মধ্যে বাড়ছে জটিলতা
তিনজন শিশু বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনের ঘাটতি, মস্তিষ্কে প্রদাহ, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া ও খিঁচুনির মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এতে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে।
তাদের মতে, হাম পরীক্ষার সুবিধা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। এতে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা সহজ হবে এবং রাজধানীর ওপর চাপও কমবে।
জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণার দাবি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, মহামারি মোকাবিলায় ডেথ রিভিউ, সমন্বিত চিকিৎসা প্রোটোকল, ব্যাপক পরীক্ষা, আইসোলেশন ও জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব ধাপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হামের পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করার পর সরকারের জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা উচিত ছিল। এতে একদিকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা জোরদার করা যেত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব হতো।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক মঈনুল আহসান জানিয়েছেন, কিট সংকটের বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে হাম পরীক্ষার কিট সরবরাহ এখনো অনেকটাই আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















