সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা একসময় ছিল সবুজে ঢাকা শান্ত ও আকর্ষণীয় একটি পাহাড়ি এলাকা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ঘুরতে যেতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর তোলার কারণে সেই টিলার চেহারা পুরো বদলে গেছে। এখন সেখানে দেখা যায় শুধু গভীর গর্ত আর ধ্বংসের চিহ্ন। স্থানীয়রা বলছেন, “আগে যেখানে টিলা ছিল, এখন সেখানে শুধু পানি ভরা খাদ।”
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব আর প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এখানে অবৈধভাবে পাথর তোলা হচ্ছে। নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে টিলার ভেতর থেকে পাথর তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন পুরো এলাকায় ছোট-বড় অন্তত ১০০টি গর্ত রয়েছে। কিছু গর্তের গভীরতা ২০০ থেকে ৩০০ ফুট পর্যন্ত।
হারিয়ে যাচ্ছে ধর্মীয় স্মৃতি
লোকমুখে প্রচলিত আছে, প্রায় ৭০০ বছর আগে হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) এই এলাকায় এসেছিলেন। তার স্মৃতিকে ঘিরে সেখানে আস্তানা, মসজিদ ও কবরস্থান গড়ে ওঠে। প্রতি বছর ওরসও হতো সেখানে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসতেন।

কিন্তু এখন সেই টিলার বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু টিলাই নয়, আস্তানা ও আশপাশের অনেক অংশও পাথর তুলতে গিয়ে নষ্ট করা হয়েছে।
স্থানীয় আইনজীবী ফরহাদ খন্দকার বলেন, আগে এখানে মানুষ ঘুরতে আসত, ওরস হতো। এখন শুধু গর্ত দেখা যায়। এই ঐতিহ্য আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না।
টিলা এখন মৃত্যুকূপ
টিলার বিভিন্ন জায়গায় এখনও পড়ে আছে ‘বোমা মেশিন’। এগুলো দিয়ে মাটি ও পাথর টেনে তোলা হয়। যদিও অনেক বছর আগেই আদালত এই যন্ত্র নিষিদ্ধ করেছে।
টিলার গর্তগুলোতে এখন নীল রঙের পানি জমে আছে। দূর থেকে দেখলে অনেকেই এগুলোকে জলাশয় মনে করেন। কিন্তু এগুলো আসলে পাথর তোলার কারণে তৈরি হওয়া গভীর খাদ। আশপাশের বাড়িঘরও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, রাতের বেলায় ট্রলি ও ট্রাক্টরে করে পাথর ভোলাগঞ্জের ক্রাশার মিলে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক সময় পাথরের ওপরে বালু ঢেকে পরিবহন করা হয়।
শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনাও কম নয়

অবৈধভাবে পাথর তুলতে গিয়ে বহু শ্রমিক মারা গেছেন। পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জন শ্রমিক গর্ত ধসে মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেক মানুষ।
২০১৭ সালে একদিনেই ছয় শ্রমিক মারা যাওয়ার পর প্রশাসন অভিযান চালিয়েছিল। তখন অনেক ‘বোমা মেশিন’ ধ্বংস করা হয়। কিন্তু পরে আবারও শুরু হয় পাথর উত্তোলন।
কোটি টাকার পাথর লুটের অভিযোগ
দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মামলায় বলা হয়েছে, শাহ আরেফিন টিলা থেকে ২৫২ কোটির বেশি টাকার পাথর অবৈধভাবে তোলা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ ওঠে, ইজারার শর্ত ভেঙে বছরের পর বছর পাথর উত্তোলন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কেউ প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো হতো।
সম্প্রতি প্রশাসন কয়েকটি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ পাথর জব্দ করেছে। তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, কঠোর ব্যবস্থা না নিলে শাহ আরেফিন টিলার অবশিষ্ট অংশও রক্ষা করা যাবে না।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















