ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের দর নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় মুদ্রাবাজারে বাড়ছে সতর্কতা। জাপান সরকার সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এমনকি ছুটির সময়ও মোবাইল ফোন সচল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাটায়ামা।
জাপানের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য জাপান টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত দুই মাস ধরে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার ১৫৮ থেকে ১৫৯-এর মধ্যে আটকে আছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থিতি স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতির কারণে নয়, বরং জাপান সরকারের সক্রিয় অবস্থানের ফল।
ছুটির মধ্যেও সতর্ক থাকার নির্দেশ
গোল্ডেন উইক ছুটির আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী কাটায়ামা মুদ্রা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, বাইরে থাকুন বা বিশ্রামে থাকুন—সবসময় স্মার্টফোন সঙ্গে রাখুন। তার এই মন্তব্যকে অনেকেই সম্ভাব্য বাজার হস্তক্ষেপের আগাম সংকেত হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৪ সালেও একই ধরনের ছুটির সময় জাপান সরকার একাধিকবার ইয়েন শক্তিশালী করতে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছিল। এরপর জুলাই মাসেও ইয়েন কেনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ইয়েনের জন্য ‘সুইট স্পট’
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রশাসন ইয়েনকে অতিরিক্ত শক্তিশালী করতে চায় না। সরকারের এক জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সম্প্রতি জানিয়েছেন, ডলারের বিপরীতে ১৫০ ইয়েনের আশপাশকে তারা অর্থনীতির জন্য উপযোগী অবস্থান হিসেবে দেখেন। এতে দেশীয় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে উৎসাহ পায়।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, জাপান সরকার ১৬০ ইয়েনের সীমাকে এক ধরনের ‘লাল দাগ’ হিসেবে বিবেচনা করছে। অর্থাৎ এই সীমা অতিক্রম করলে সরকার আরও বড় হস্তক্ষেপে যেতে পারে।
শুধু সুদহার বাড়িয়ে কাজ হয়নি

অনেক সমালোচক মনে করেন, বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সরকার শুধু অর্থ অপচয় করছে। তাদের মতে, ইয়েন শক্তিশালী করতে সুদের হার আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যাংক অব জাপান ২০২৪ সাল থেকে চারবার সুদের হার বাড়ালেও ইয়েনের দুর্বলতা কমেনি। বরং নেতিবাচক সুদের যুগের তুলনায় এখন ইয়েন আরও দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ইঙ্গিত
একসময় জাপান সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ডলার-ইয়েন বিনিময় হার নিয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করলে বাজারে ইয়েনের দর হঠাৎ বেড়ে যায়। পরে জানা যায়, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও এশিয়ার মুদ্রাগুলোকে আরও শক্তিশালী দেখতে চান বলে বিভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা ওনের দুর্বলতা নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
তেলবাজারেও হস্তক্ষেপ ভাবনা
শুধু মুদ্রাবাজার নয়, জাপান এখন জ্বালানি বাজারেও হস্তক্ষেপের চিন্তা করছে। দেশটির শীর্ষ মুদ্রা কর্মকর্তা আতসুশি মিমুরা জানিয়েছেন, অপরিশোধিত তেলের ফিউচার বাজারে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা ইয়েনের ওপর চাপ তৈরি করছে। তাই সরকার প্রয়োজন হলে সেখানে পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই নীতি দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে হলে জাপানের যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন হবে। কারণ এককভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করার সক্ষমতা সীমাহীন নয়। তবে আপাতত জাপানের বার্তা পরিষ্কার—ইয়েন নিয়ে লেনদেন করলে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















