তামিল সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতির বড় মুখ হয়ে ওঠা সি. জোসেফ বিজয়ের যাত্রা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। তামিলাগা ভেত্রি কাজাগম (টিভিকে) গঠনের বহু আগেই তিনি ধীরে ধীরে তামিলনাড়ুর তৃণমূল পর্যায়ে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। সামাজিক উদ্যোগ, জনসম্পৃক্ততা, দুর্যোগে সহায়তা এবং আঞ্চলিক ইস্যুতে অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে টিভিকে চালু করার আগে থেকেই বিজয় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত জনসম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সিনেমা থেকে জনমুখী ইমেজ
পরিচালক এস. এ. চন্দ্রশেখরের হাত ধরে সিনেমায় আসা বিজয় শুরু থেকেই পারিবারিক ও বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ধীরে ধীরে তাঁর ভক্তগোষ্ঠী বড় হতে থাকে। এই জনপ্রিয়তাকে সংগঠিত রূপ দিতে ২০০৯ সালে গঠন করা হয় ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ বা ভিএমআই।

এই সংগঠনের অধীনে তামিলনাড়ু জুড়ে ৮০ হাজারের বেশি ফ্যান ক্লাব ইউনিট গড়ে ওঠে। পরে এই সংগঠনই বিজয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়।
কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তা
ভিএমআইয়ের মাধ্যমে বিজয় বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালু করেন। এর মধ্যে ছিল বিনামূল্যে খাবার বিতরণ কেন্দ্র, শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি সেন্টার, কম্পিউটার বিতরণ এবং রক্তদান শিবির আয়োজন।
শুধু সামাজিক উদ্যোগেই নয়, দুর্যোগের সময়ও সংগঠনটি সক্রিয় ছিল। ২০১১ সালের সাইক্লোন থানে, ২০১৫ সালের চেন্নাই বন্যা এবং ২০১৮ সালের সাইক্লোন গাজা চলাকালে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা।
আঞ্চলিক ও জাতীয় ইস্যুতে অবস্থান
বিভিন্ন সময় আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতেও সরব ছিলেন বিজয়। ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কার তামিলদের প্রতি সংহতি জানিয়ে চেন্নাইয়ে অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি ও তাঁর সমর্থকেরা।

২০১১ সালে শ্রীলঙ্কান নৌবাহিনীর হাতে তামিলনাড়ুর জেলেদের গ্রেপ্তার ও হামলার প্রতিবাদে নাগাপট্টিনমে বড় ধরনের অনশন কর্মসূচি আয়োজন করেন বিজয়।
২০১৭ সালে জল্লিকাট্টু নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে হওয়া আন্দোলনের সময় গভীর রাতে মুখ ঢেকে চেন্নাইয়ের মেরিনা সৈকতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নীরব সংহতি প্রকাশ করেন তিনি। একই বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিটে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থী এস. অনিতার পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেন বিজয়।
২০১৮ সালে থুথুকুডিতে অ্যান্টি-স্টারলাইট আন্দোলনে পুলিশ গুলিতে নিহতদের পরিবারের বাড়িতে যান তিনি। গণমাধ্যমের নজর এড়াতে মোটরসাইকেলের পেছনে বসে সেখানে পৌঁছান।
রাজনৈতিক যোগাযোগ ও নির্বাচনী প্রস্তুতি
বছরের পর বছর বিভিন্ন জাতীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক কর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছেন বিজয়। ২০০৯ সালে রাহুল গান্ধী, ২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারে এবং ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তামিলনাড়ুর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনাও আয়োজন করেছেন তিনি। এসব কার্যক্রম তরুণদের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।
২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভিএমআইয়ের অনেক সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে শতাধিক প্রার্থী জয়ী হন। বিশ্লেষকদের মতে, এটিই ছিল বিজয়ের ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতির প্রথম বড় পরীক্ষা।
বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান
বিজয়ের দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক উপস্থিতিই এখন তাঁর রাজনৈতিক শক্তির বড় ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিনেমার জনপ্রিয়তাকে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রভাবে রূপান্তর করতে তিনি যে পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছেন, টিভিকে’র উত্থান তারই ফল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।



















