দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিষেধক টিকার সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। কুকুর, বিড়াল, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আহত রোগীরা সময়মতো টিকা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। সরকারি হাসপাতালে টিকা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে কয়েকগুণ বেশি দামে টিকা কিনছেন। আবার বাজারেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ডোজ সম্পন্ন করতে পারছেন না বহু রোগী। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘ কয়েক মাস ধরেই চাহিদার তুলনায় টিকার সরবরাহ কম। যে পরিমাণ বরাদ্দ আসে, তা এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ফলে প্রতিদিন হাসপাতালে এসে অনেক রোগীকেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
বরিশালে চার মাস ধরে সংকট

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে গত চার মাস ধরে জলাতঙ্ক টিকা নেই। রোগীরা অভিযোগ করছেন, হাসপাতালে গেলে বাইরে থেকে টিকা কিনে আনতে বলা হচ্ছে। শুধু টিকাই নয়, সঙ্গে সিরিঞ্জও কিনতে হচ্ছে রোগীদের। কেউ কেউ একটি টিকা চারজন মিলে ভাগ করে নিচ্ছেন। আবার অনেককে একেকটি টিকার জন্য দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
বিড়ালের কামড়ে আহত মো. শাকিল জানান, বরিশালের কোনো ফার্মেসিতেই টিকা পাননি তিনি। পরে বাধ্য হয়ে ঝালকাঠি থেকে দেড় হাজার টাকায় টিকা কিনতে হয়েছে। হাসপাতালের এক নার্স জানিয়েছেন, প্রতিদিন শতাধিক রোগী এলেও চাহিদার চার ভাগের এক ভাগ টিকাও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত টিকা সরবরাহের আশা করা হচ্ছে।
রাঙামাটিতেও একই পরিস্থিতি
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালেও গত চার মাস ধরে জলাতঙ্ক টিকার সংকট চলছে। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় নিম্নআয়ের রোগীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকেই বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনে চারজন মিলে ভাগ করে নিচ্ছেন। হাসপাতালে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে টিকা পাচ্ছেন না।
হাসপাতালের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নিখিল প্রিয় চাকমা জানিয়েছেন, গত ডিসেম্বর থেকে ঢাকা থেকে টিকার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী হাসপাতালে এলেও প্রয়োজন অনুযায়ী টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বাজেট সংকটের কারণে হাসপাতাল নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও টিকা কিনতে পারছে না।

কুড়িগ্রামে অপ্রতুল সরবরাহ
কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে কিছু টিকা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নিস্বর্গ মেরাজ চৌধুরী জানান, সম্প্রতি কিছু টিকা পাওয়া গেছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, কুকুর ও বিড়ালের কামড় বা রক্ত বের হওয়া আঁচড়ের ক্ষেত্রে টিকা জরুরি হলেও আতঙ্কে অনেকেই অপ্রয়োজনেও টিকা নিচ্ছেন। এতে চাহিদা আরও বেড়ে যাচ্ছে।
গাজীপুরেও দীর্ঘদিনের সংকট
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় ছয় থেকে সাত মাস ধরে জলাতঙ্ক টিকার সংকট চলছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা বিজন মালাকার বলেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। কিন্তু বাজারে সংকট থাকায় অনেকে নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করতে পারছেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু বরিশাল বিভাগেই মাসে প্রায় ৯ হাজার ৭৪০ ভায়াল টিকার চাহিদা রয়েছে। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৮০ ভায়াল। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর এখনও সেই চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















