লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্ত এলাকায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের একটি নজরদারি ড্রোন বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশের পর বিধ্বস্ত হয়েছে। পরে সেটি উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ঘটনাটি ঘিরে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে বুড়িমারী ইউনিয়নের মোগলীবাড়ি সীমান্ত এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত পিলার ৮৪১/৮এস থেকে প্রায় ২০ গজ ভেতরে বাংলাদেশের একটি ভুট্টাখেতে বিকট শব্দে ড্রোনটি পড়ে যায়। তখন মাঠে কাজ করা কৃষকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পরে তারা দ্রুত বুড়িমারী বিওপির বিজিবি সদস্যদের খবর দেন। খবর পেয়ে তিস্তা ব্যাটালিয়নের ৬১ বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ড্রোনটি উদ্ধার করে নিয়ে যান।
কীভাবে বিধ্বস্ত হলো ড্রোন

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার ৯৮ হিমালয়া ক্যাম্প থেকে বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও ভিডিও ধারণের জন্য ড্রোনটি পরিচালনা করছিলেন। একপর্যায়ে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটি বাংলাদেশের ভেতরে পড়ে যায়।
ড্রোনটি ভুট্টাখেতে কাজ করা এক কৃষকের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার পর হঠাৎ বিকট শব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ে। এতে আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, ড্রোনটি বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতার কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে তুরস্কের আধুনিক কাউন্টার-আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেম ‘ইলটার জে৩৫০’ সংগ্রহ করা হয়। এই প্রযুক্তি ছোট ও মাঝারি আকারের ড্রোন শনাক্ত, অনুসরণ এবং নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।

এছাড়া গত মাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ফ্রান্সের তৈরি থ্যালেস গ্রাউন্ড মাস্টার ৪০৩এম রাডার সিস্টেমের দুটি ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। বর্তমানে একটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং অন্যটি বগুড়ায় পরিচালিত হচ্ছে।
সীমান্তে বাড়তি টহল
ড্রোন বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত এলাকায় টহল বাড়িয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ডিভাইসটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা থেকেই এ তৎপরতা বাড়ানো হয়। এতে সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।
এদিকে বিজিবি এখনো ঘটনাটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নজমুল হক বলেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ড্রোন উদ্ধারের খবর জেনেছেন, তবে বিজিবি থেকে পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
কৌশলগত গুরুত্বে লালমনিরহাট

সাম্প্রতিক সময়ে লালমনিরহাট জেলা কৌশলগত গুরুত্বের কারণে আলোচনায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পরিত্যক্ত লালমনিরহাট বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনার খবর সামনে আসে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন ও শিল্পায়নকে গতিশীল করার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
ভারতের শিলিগুড়ি করিডর থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থানের কারণে বিষয়টি ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করে। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক অপারেশন পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, লালমনিরহাট বিমানবন্দরকে সামরিক কাজে ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা নেই। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্যেই এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে বিমানবন্দর পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য কারিগরি আগ্রহের খবরও ভারতীয় মহলে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফলে সীমান্তের এই শান্ত অঞ্চল এখন আঞ্চলিক কৌশলগত নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















