দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের জোট রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ডিএমকে ও কংগ্রেসের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেল। মাঝখানে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাময়িক বিচ্ছেদ হলেও পরে আবার একসঙ্গে এসেছিল দুই দল। তবে ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের পর সেই সম্পর্ক এবার স্থায়ীভাবে শেষ হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে বারবার টানাপোড়েনই শেষ পর্যন্ত এই জোটের পতনের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০১১ সালেও দুই দলের মধ্যে আসন নিয়ে কঠিন দরকষাকষি হয়েছিল। তখন কংগ্রেস ৯০টি আসন দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত ৬০টির বেশি আসন পায়। একইভাবে ২০২৬ সালেও আলোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে সম্পর্ক প্রায় ভাঙনের মুখে পড়ে যায়।
জোট রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ডিএমকে ও কংগ্রেস একসময় শক্তিশালী জোট হিসেবে পরিচিত ছিল। বিজেপি ও তাদের আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে এই জোটকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ হিসেবেও দেখা হতো। তবে সম্পর্কের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ জমে ছিল।
২০০৪ সালে ডিএমকে নেতা এম. করুণানিধি নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দাবি করেন। সেই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দলের মন্ত্রীরা শপথ নেবেন না বলেও ঘোষণা দেন। সে সময় কংগ্রেস মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল থাকায় শেষ পর্যন্ত ডিএমকের দাবি মেনে নেয়।
কিন্তু ২০০৯ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। কংগ্রেস গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিজেদের কাছেই রেখে দেয়। পরে টুজি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি নিয়ে দুই দলের দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ডিএমকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার থেকে বেরিয়ে আসে। যদিও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আবার তারা একসঙ্গে হয়।
বিজেপি ফ্যাক্টর ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
তামিলনাড়ুতে উপযুক্ত বিকল্প জোটসঙ্গী না থাকায় কংগ্রেস দীর্ঘদিন এই জোট ধরে রেখেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এআইএডিএমকে অনেক সময় নরম হিন্দুত্ববাদী অবস্থান নিয়েছে এবং বিজেপির সঙ্গে তাদের সম্পর্কও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ছিল।
একজন জ্যেষ্ঠ কংগ্রেস নেতা জানিয়েছেন, বহুদিন ধরেই দলটির ভেতরে জোট ছাড়ার আলোচনা চলছিল। কিন্তু সঠিক সময় ও কারণ পাওয়া যাচ্ছিল না। ২০২৬ নির্বাচনের পর টিভিকে নেতা বিজয় যোগাযোগ করলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। দলীয় কর্মীদের বড় অংশও ডিএমকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে।
স্ট্যালিনের অসন্তোষ
ডিএমকে নেতৃত্বও নির্বাচনের আগেই কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত অনেকটা নিয়ে ফেলেছিল বলে জানা গেছে। বিশেষ করে আসন ভাগাভাগির আলোচনায় তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ভূমিকা নিয়ে ডিএমকে প্রধান এম. কে. স্ট্যালিন অসন্তুষ্ট ছিলেন।
স্ট্যালিন মনে করেছিলেন, রাহুল গান্ধীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আলোচনার পুরো সময়ে রাহুল তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণাতেও দুজনকে একই মঞ্চে দেখা যায়নি।
নির্বাচনে জয়ী কংগ্রেস প্রার্থীদের স্ট্যালিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ধন্যবাদ জানানোর প্রস্তাবও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়। এরপর থেকেই দুই দলের সম্পর্ক কার্যত শেষ বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
তবে কংগ্রেসের ভেতরেও নতুন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দলের এক নেতা প্রশ্ন তুলেছেন, বিজয়ের নেতৃত্বাধীন নতুন জোট ভবিষ্যতে বিজেপির বিরুদ্ধে কতটা দৃঢ় অবস্থান নেবে, সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।
তিনি বলেন, ডিএমকের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু স্ট্যালিন যেভাবে বিজেপির বিরোধিতা করেছেন, সেই ধরনের অবস্থান বিজয় নেবেন কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এই ভাঙন নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আলোচনা চলছে।
তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-কংগ্রেস জোট ভাঙনের পর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















