যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে বড় কোনো আইন তো দূরের কথা, ন্যূনতম কাজ করাও কঠিন হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিভাজন, দলীয় সংঘাত, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা এবং সদস্যদের ক্রমবর্ধমান হতাশা—সব মিলিয়ে মার্কিন আইনসভা এখন গভীর সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের নানা ঘটনা সেই সংকটকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সম্প্রতি ৭৬ দিন আংশিকভাবে বন্ধ থাকার পর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের অর্থায়ন পুনরায় চালুর একটি বিল পাস হয় প্রতিনিধি পরিষদে। তবে সেটিকে বড় সাফল্য নয়, বরং কংগ্রেসের দুর্বল অবস্থাকে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। রিপাবলিকান নেতৃত্বও স্বীকার করছে, বর্তমান পরিস্থিতি তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জনসমর্থনে তলানিতে কংগ্রেস
মার্কিন জনগণের চোখে কংগ্রেসের ভাবমূর্তি এখন প্রায় তলানিতে। সাম্প্রতিক জরিপে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ কংগ্রেসের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে, বিপরীতে অসন্তুষ্টির হার ৮৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দশকে কংগ্রেস কখনও এতটা অজনপ্রিয় অবস্থায় যায়নি।
গত বছরের দীর্ঘ সরকারি অচলাবস্থার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পূর্ণাঙ্গ সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকার দীর্ঘতম সময় ছিল ৪৩ দিন। এরপর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ নিয়েও তৈরি হয় নতুন সংকট। এসব ঘটনায় জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কংগ্রেস এখন কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনার সক্ষমতা হারাচ্ছে।
কমছে আইন পাসের গতি
বর্তমান কংগ্রেসে আইন পাসের হারও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। চলতি মেয়াদের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ৯০টি আইন পাস হয়েছে। আগের কংগ্রেসে পাস হয়েছিল ২৭৪টি আইন, যা গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন ছিল। এবার সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ২৫০টির বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যা তার প্রথম মেয়াদের পুরো সময়ের তুলনায়ও বেশি। শুল্ক আরোপ কিংবা সামরিক পদক্ষেপের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও কংগ্রেসকে এড়িয়ে যাওয়ার সমালোচনা বাড়ছে।
দুই কক্ষেই বাড়ছে হতাশা
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই এখন তীব্র হতাশা বিরাজ করছে। রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের ওপর অচলাবস্থার দায় চাপাচ্ছে, আবার প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান সদস্যরাই সিনেটের রিপাবলিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে এমন বিল পাঠানো হয়, যা নিয়ে আলোচনা বা সংশোধনের সুযোগ থাকে না।
অন্যদিকে সিনেটের সদস্যরা বলছেন, প্রতিনিধি পরিষদ এখন এতটাই বিভক্ত যে সেখানে কোনো ঐকমত্য তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কট্টরপন্থি গ্রুপ, আঞ্চলিক স্বার্থ আর দলীয় ভিন্নমতের কারণে প্রায় প্রতিটি বিল নিয়েই তৈরি হচ্ছে সংঘাত।
দীর্ঘ ভোট আর রাজনৈতিক নাটক
সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিনিধি পরিষদে ভোট গ্রহণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা রাখার ঘটনাও বেড়েছে। আগে যেটি খুবই বিরল ছিল, এখন সেটিই প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। জুলাই মাসে দুটি ভোট টানা সাত ও নয় ঘণ্টার বেশি সময় খোলা রাখা হয়, যাতে দলীয় নেতারা অনাগ্রহী সদস্যদের রাজি করাতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতারই প্রতিফলন। কারণ নেতৃত্ব এখন আর নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না, কোনো বিল ভোটে টিকবে কি না। ফলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
সামনের নির্বাচনে বড় ঝুঁকি
আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্য আরও উদ্বেগের হয়ে উঠছে। ইতোমধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের প্রতি আটজন সদস্যের মধ্যে একজন পুনর্নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একইভাবে কয়েকজন সদস্য সম্ভাব্য বহিষ্কার এড়াতে পদত্যাগও করেছেন। সিনেট থেকেও একাধিক সদস্য বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
অনেক অভিজ্ঞ সাবেক আইনপ্রণেতা বলছেন, কংগ্রেসে এখন যে অচলাবস্থা চলছে, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যও হুমকির ইঙ্গিত বহন করছে। সমঝোতার রাজনীতি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বারবার আটকে যাচ্ছে। আর সেই সুযোগে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরও বাড়ছে।
মার্কিন কংগ্রেসে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, আইন পাসে ধীরগতি ও দলীয় বিভাজন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















