বিশ্বজুড়ে চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ সম্প্রচারের ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলা গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব টেড টার্নার আর নেই। ৮৭ বছর বয়সে তার মৃত্যুতে শুধু মিডিয়া জগতই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনায়ও এক যুগের অবসান ঘটেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত হলেও জীবনের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় করেছেন জমি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সাহসী সিদ্ধান্তের পেছনে।
সংবাদ বিপ্লবের পথিকৃৎ
যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটিতে জন্ম নেওয়া টেড টার্নার বাবার বিলবোর্ড ব্যবসা থেকে নিজের যাত্রা শুরু করেন। পরে সেটিকেই তিনি বিশাল সম্প্রচার সাম্রাজ্যে রূপ দেন। তার প্রতিষ্ঠিত সংবাদ চ্যানেল সিএনএন বিশ্বে চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ সম্প্রচারের নতুন যুগ শুরু করে। পরবর্তীতে তার প্রতিষ্ঠান টাইম ওয়ার্নারের কাছে বিক্রি হলেও সংবাদমাধ্যমে তার প্রভাব অটুট ছিল।
তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি টার্নারের আরেকটি পরিচয় ছিল বিশাল ভূমির মালিক হিসেবে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়টি অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২০ লাখ একর জমির মালিক ছিলেন। এ কারণে তাকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যক্তিগত ভূমি মালিক হিসেবে ধরা হতো।
জমি আর বাইসন রক্ষার মিশন
টেড টার্নার শুধু জমি কিনেই থেমে থাকেননি। তার মালিকানাধীন ১৩টি বড় র্যাঞ্চে প্রায় ৪৫ হাজার বাইসন লালন করা হতো। একসময় বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়া এই প্রাণীকে ফিরিয়ে আনতে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার মতে, সমাজের শীর্ষ ধনী শ্রেণির মানুষদের সমাজ ও প্রকৃতির জন্য দায়িত্ব পালন করা উচিত।
নিউ মেক্সিকোর বিশাল ভেরমেজো পার্ক র্যাঞ্চ ছিল তার সবচেয়ে পরিচিত সম্পত্তিগুলোর একটি। কয়েক দশক আগে যে জমি তিনি প্রায় ১০ কোটি ডলারে কিনেছিলেন, বর্তমানে তার মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষি গবেষণা এবং ইকো-ট্যুরিজমের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে টার্নার তার জমিগুলোকে শুধু ব্যবসায়িক সম্পদ নয়, টেকসই প্রকল্পে রূপ দেন।

সমুদ্রের দুঃসাহসী নাবিক
টেড টার্নারের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল তিনি একজন দক্ষ নৌযান প্রতিযোগী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে আমেরিকাস কাপ জয়ের মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন। সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তার সহকর্মীদের ভাষায়, তিনি কখনও নিরাপদ খেলা পছন্দ করতেন না; বরং ঝুঁকি নিয়ে জিততে চাইতেন।
১৯৭৯ সালের ভয়াবহ ফাস্টনেট নৌদৌড়েও তিনি অংশ নেন। সেই প্রতিযোগিতায় প্রচণ্ড ঝড়ে বহু নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। কিন্তু টার্নারের দল নিরাপদে থেকে প্রতিযোগিতা শেষ করে। সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখতেন।
ঝুঁকি নেওয়ার দর্শন
টেড টার্নারের জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত। ব্যবসা, ক্রীড়া, পরিবেশ সংরক্ষণ কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সবসময় বড় লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছেন। তার সহকর্মীদের মতে, হারার ভয় নয়, চেষ্টা না করার ভয়ই তাকে বেশি তাড়িত করত। সেই মানসিকতাই তাকে একদিকে সংবাদ বিপ্লবের নায়ক, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী ভূমি সংরক্ষণ উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে।
টেড টার্নারের মৃত্যুতে বিশ্ব হারালো এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি একই সঙ্গে মিডিয়া, ব্যবসা, ক্রীড়া ও পরিবেশ আন্দোলনে গভীর ছাপ রেখে গেছেন।
মিডিয়া সম্রাট টেড টার্নারের মৃত্যুতে আলোচনায় তার সংবাদ বিপ্লব, বিশাল ভূমি সাম্রাজ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















