মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে সারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে খাদ্যের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায়। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি ও সারের বাজারে চাপ
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি সারের অন্যতম বড় সরবরাহকারী অঞ্চল। যুদ্ধের কারণে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সারের উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সারের গড় দাম ৩০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে, আর ইউরিয়ার দাম বাড়তে পারে প্রায় ৬০ শতাংশ।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সারের এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। অনেক কৃষক পর্যাপ্ত সার ব্যবহার করতে না পারলে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে। ফলে বাজারে খাদ্যের দাম বাড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ আরও বাড়বে।
খাদ্যনিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমানে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সারের বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বড় সংকট তৈরি করতে পারে। যুদ্ধের কারণে যদি জ্বালানি ও সারের দাম আরও বাড়ে, তাহলে কোটি কোটি মানুষ নতুন করে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ এসব দেশে কৃষকেরা আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা অনেক সময় রাখেন না। এতে খাদ্য উৎপাদন কমার পাশাপাশি গ্রামীণ দারিদ্র্যও বাড়তে পারে।

তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব
যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লাগে। মার্চ মাসেই প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে যায়। এর ফলে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ফেব্রুয়ারির শেষের ৭২ ডলার থেকে মার্চের শেষে ১১৮ ডলারে পৌঁছে যায়।
বিশ্বব্যাংক মনে করছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের বেশি হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
দারিদ্র্য বাড়ার শঙ্কা
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। যুদ্ধের কারণে যদি সারের সংকট আরও গভীর হয়, তাহলে কৃষি উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে যেসব দেশ খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। এতে নতুন করে দারিদ্র্য বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
সরকারগুলোর জন্য সতর্কবার্তা
বিশ্বব্যাংক বলছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারগুলোকে দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা, কৃষি খাতে প্রণোদনা এবং খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সারের দাম বাড়ায় খাদ্য উৎপাদন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















