আনুষ্ঠানিক কথাটা শুরুতেই বলে নেওয়া যাক। ন্যাশনাল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত ‘জুরবারান’ প্রদর্শনী আমার দেখা সেরা শিল্পপ্রদর্শনীগুলোর একটি। এটি দেখার জন্য যা করার দরকার, তাই করুন। প্রয়োজনে দাদির মাটির ব্যাংকও ভেঙে ফেলুন। কারণ এই অভিজ্ঞতা তার চেয়েও বেশি মূল্যবান।
কেন এমন বলছি? উত্তরটা সহজ নয়। এখানে ধর্মীয় অনুভূতি আছে, নন্দনতত্ত্ব আছে, আর আছে এমন এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিঘাত, যা ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এক অসাধারণ শিল্পী মানুষের আত্মার গভীরতম স্তরের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষায় কথা বললেও আত্মার ভাষা আলাদা—সেটা সবার কাছেই পৌঁছে যায়।
ফ্রান্সিসকো দে জুরবারান (১৫৯৮-১৬৬৪) ছিলেন স্পেনের স্বর্ণযুগের শিল্পী। সেই সপ্তদশ শতকই দিয়েছিল দিয়েগো ভেলাসকেস, মুরিয়ো, হুয়ান মার্তিনেস মন্তানিয়েস, পেদ্রো দে মেনা এবং এল গ্রেকোর মতো শিল্পীদের। স্প্যানিশ শিল্পকলার ইতিহাসে এত শক্তিশালী সময় আর খুব কমই এসেছে।

অনেকেই হয়তো ভেলাসকেসকে সেই যুগের শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলবেন। কিন্তু আমার মতে জুরবারানের দাবিটাও কম শক্তিশালী নয়। তিনি ভেলাসকেসের মতো বাস্তবতাকে জীবন্ত করে তুলতে পারতেন, তবে তার ছবিতে ছিল আরও গভীর অন্ধকার, আরও অস্বস্তিকর রহস্যময়তা। সেই অদ্ভুত শক্তিই তাকে আলাদা করে তোলে।
প্রদর্শনীর প্রথম ছবিটিই তার প্রমাণ। সেখানে দেখা যায় সেন্ট পিটার নোলাসকো স্বপ্ন বা দর্শনে দেখছেন ক্রুশবিদ্ধ সেন্ট পিটারকে। বিষয়টি ধর্মীয় হলেও তা বোঝার জন্য দর্শকের ধর্মতত্ত্ব জানা জরুরি নয়। শুধু ছবিটির দিকে তাকালেই যথেষ্ট।
একজন সাদা পোশাক পরা ছায়াময় মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। তার সামনে উল্টোভাবে ক্রুশবিদ্ধ প্রায় নগ্ন এক মানুষ। চারপাশে গাঢ় অন্ধকার। তারা কোথায়, সেটিও বোঝা যায় না।
ছবির উল্টো হয়ে থাকা মুখটি যদি সোজা করে দেখা যায়, তবে তা শান্ত মনে হবে। কিন্তু ছবির ভেতরে সেই মুখটিই ভয়াবহ ও শয়তানি মনে হয়। এই ধরনের ধর্মীয় দৃশ্য কল্পনা করতে যে শিল্পী সক্ষম, তার মধ্যে ছিল দুঃসাহস, কল্পনাশক্তি এবং এক ধরনের উন্মত্ত সৃজনশীলতা। এটাই জুরবারানের বৈশিষ্ট্য।
প্রদর্শনীর শুরুতেই রয়েছে আরেকটি ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ছবি। অত্যন্ত সংযত বিন্যাস—শুধু যিশু, ক্রুশ এবং অন্ধকার। এখানে ছায়ার ব্যবহার এত নাটকীয় যে মনে হয় যিশুর ঘর্মাক্ত শরীর অন্ধকার ভেদ করে দর্শকের সামনে বেরিয়ে আসছে।

আরও একটি ছবিতে দেখা যায় সেন্ট সেরাপিয়নকে। তার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা জরুরি নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কীভাবে তাকে দুই দড়ির মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং তার সাদা পোশাকের সূক্ষ্ম বুননকে কী অবিশ্বাস্য নিখুঁততায় আঁকা হয়েছে।
আমি নিজেই সেন্ট সেরাপিয়নের পোশাকের দিকে তাকিয়ে প্রায় পনেরো মিনিট কাটিয়েছি। তারপর আবার ফিরে গেছি যিশুর সরু কোমরবন্ধনী দেখতে। কাপড়ের ভাঁজ, বুনন ও আলো ধরতে জুরবারানের মতো দক্ষ শিল্পী খুব কমই ছিলেন। হয়তো তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘কাপড়ের চিত্রকর’।
কেন তিনি এত দক্ষ ছিলেন? এর উত্তর আমি পেয়েছিলাম তার জন্মস্থান এক্সত্রেমাদুরার ফুয়েন্তে দে কান্তোসে গিয়ে। ছোট্ট, সাদা রঙের, রোদে পোড়া, নির্জন এক জনপদ। যেন পুরোনো স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের দৃশ্য।
সেখানে জানা যায়, জুরবারানের বাবা ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। তিনি সেভিলের ধনীদের কাছে দামি সিল্ক বিক্রি করতেন। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, জুরবারান তার ছবির মধ্য দিয়েই বাবার কাপড়ের বিজ্ঞাপন করতেন।
এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নারী সাধুদের ছবিগুলোতে। সেন্ট আপোলোনিয়া, যার সব দাঁত উপড়ে ফেলা হয়েছিল, তাকে দেখা যায় নরম গোলাপি ও হলুদ পোশাকে। মুসলিম রাজকন্যা সেন্ট কাসিলদার পোশাকে আছে বাদামি ও রুপালি নকশার অপূর্ব কাপড়। পুরো প্রদর্শনীজুড়েই বোঝা যায় কাপড় সম্পর্কে বাবার জ্ঞান কী গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল জুরবারানকে।

সেন্ট ফ্রান্সিসের ছবিগুলোও অসাধারণ। সেখানে মোটা, রুক্ষ সন্ন্যাসী পোশাককে এমন নিখুঁতভাবে আঁকা হয়েছে যে দর্শক বিস্মিত না হয়ে পারে না।
সবচেয়ে রহস্যময় ছবিগুলোর একটিতে দেখা যায় পোপ নিকোলাস পঞ্চমের সেই দর্শন, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, আসিসির সমাধিক্ষেত্রে সেন্ট ফ্রান্সিসের মৃতদেহ অক্ষত অবস্থায় দেখেছেন। জুরবারান সেই অলৌকিক দৃশ্যকে এমনভাবে এঁকেছেন, যেন অসম্ভব ঘটনাটিও বাস্তব বলে মনে হয়। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সেন্ট ফ্রান্সিসের মুখ আজও মনে গেঁথে থাকে।
প্রদর্শনীতে আরও আছে তার বিখ্যাত স্থিরচিত্র। সাধারণ কিছু হাঁড়ি, থালা বা জগ—কিন্তু সেগুলোর মধ্যেও আছে কঠোর সংযমের সৌন্দর্য। যেন ফল ও খাবারে ভর্তি জাঁকজমকপূর্ণ বারোক টেবিলগুলোর বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ।
এক পর্যায়ে কিউরেটররা দর্শকের সামনে হাজির করেন বিশাল এক আঁকা মাথা—আট ফুট বাই সাত ফুট। তাদের ধারণা, এটি হয়তো জুরবারানের হারিয়ে যাওয়া কোনো কাজ। ছবিটি এতটাই অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী যে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
তবু পুরো প্রদর্শনীজুড়ে সন্দেহের চেয়ে বিস্ময়ই বেশি। কারও কাছে জুরবারানের গভীর স্প্যানিশ ক্যাথলিক বিশ্বাস হয়তো বাধা মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে সেটিই তার কল্পনার দরজা খুলে দিয়েছে। প্রদর্শনীর বর্ণনাগুলোও দারুণ সহায়ক। প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করার মতো।
ওয়ালদেমার ইয়ানুশচাক 



















