০৯:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
আসিয়ান জ্বালানি সংকটে তড়িঘড়ি তেল ভাগাভাগি চুক্তির পথে, হরমুজ ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ রেস্তোরাঁ খাত বাঁচাতে কর কমানো ও গ্যাস সংযোগ চালুর দাবি হাওরে ভেজা ধান নিয়ে কৃষকের কান্না, মিলছে না ক্রেতা বা সরকারি সহায়তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল সংকট সীমান্তে, না অবিশ্বাসে? জ্বালানি সংকটে সংযমের আহ্বান মোদির, আমদানি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর বিজয়ের উত্থান, কংগ্রেসের সংকট এবং ভারতের বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ জাহানারা ইমাম: এক মায়ের শোক থেকে জাতির বিবেক হয়ে ওঠার গল্প টিকের কামড়ে বাড়ছে ঝুঁকি, যুক্তরাষ্ট্রে ছড়াচ্ছে ছয় বিপজ্জনক রোগ ১৯২৬ সালের ব্রিটিশ সাধারণ ধর্মঘট: শ্রমিকদের হার, না কি শাসকশ্রেণির নৈতিক পরাজয়? মা: ভালোবাসার প্রথম ঠিকানা

মায়ের হারানো স্ক্র্যাপবুক আর স্মৃতির ভেতরে ফিরে দেখা

মানুষের জীবনে এমন কিছু বস্তু থাকে, যেগুলো কেবল জিনিস নয়—সেগুলো সময়ের ভেতরে আটকে থাকা একেকটি দরজা। বহু বছর পরে হঠাৎ খুলে গেলে সেই দরজা শুধু অতীতকে মনে করায় না, বরং নতুন করে চিনতে শেখায় সেই মানুষদের, যাদের আমরা খুব কাছ থেকে দেখেও পুরোপুরি কখনও চিনিনি। একটি পুরোনো স্ক্র্যাপবুকও তেমনই হতে পারে।

একজন ছেলের কাছে তার মায়ের পুরোনো স্ক্র্যাপবুক হয়ে উঠেছিল ঠিক সেই রকম এক টাইম মেশিন। ধুলোমাখা, প্রায় ভেঙে পড়া পাতাগুলোয় ছিল ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের ছোট ছোট সংবাদপত্রের কাটিং, ছবি, হাতে লেখা নোট, অনুষ্ঠানের ঘোষণা, প্রতিযোগিতার ফলাফল। আর সেই সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন এক তরুণী—মেরি। যাকে পরে সবাই মা হিসেবে চিনেছে, কিন্তু এই স্ক্র্যাপবুকে তিনি সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ।

আমরা সাধারণত বাবা-মাকে দেখি তাঁদের পরিণত বয়সের ভেতর দিয়ে। তাঁরা আমাদের জন্য দায়িত্বশীল, সংযত, অভিভাবকসুলভ। কিন্তু তাঁদেরও তো একসময় আলাদা স্বপ্ন ছিল, আলাদা উত্তেজনা ছিল, ছিল নিজের পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা। সন্তানরা খুব কমই সেই মানুষটিকে জানতে পারে।

এই লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এখানেই—এটি কেবল একজন মায়ের স্মৃতিচারণ নয়, বরং এক নারীর হারিয়ে যাওয়া আত্মপরিচয়কে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।

স্ক্র্যাপবুকের প্রথম কাটিংয়ে দেখা যায়, মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক ইতালীয়-আমেরিকান কিশোরী গান গাইছে স্থানীয় প্রতিযোগিতায়। এরপরের পাতাগুলোয় ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে তার বেড়ে ওঠা। কোথাও চার্চের অনুষ্ঠানে গান, কোথাও রেড ক্রসের শো, কোথাও স্থানীয় থিয়েটারের প্রতিযোগিতা। একসময় সে পুরস্কারও জিতছে। দর্শকরা তার কণ্ঠে মুগ্ধ হচ্ছে। সংবাদপত্রে তার সৌন্দর্য, তার কণ্ঠ, তার উপস্থিতি নিয়ে লেখা হচ্ছে।

এই সবকিছু পড়তে পড়তে লেখক বুঝতে পারেন—তার মা শুধু সংসারী নারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন শিল্পীও। হয়তো বড় মাপের খ্যাতি তার নাগালে আসেনি, কিন্তু তার নিজের ছোট জগতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল এক উপস্থিতি।

Vintage Scrapbook Album- Memories of my Mother - Glitter & Glam made by Pam

এই উপলব্ধির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি গভীর বেদনা। কারণ আমরা জানি, সেই সময়ের আমেরিকায় মধ্যবিত্ত নারীদের জীবন কীভাবে গড়ে উঠত। বিয়ে, সংসার, সন্তান—এসবের পর ব্যক্তিগত স্বপ্নের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যেত। মেরির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। স্ক্র্যাপবুকের শেষের দিকে আর মঞ্চের খবর নেই; আছে বিয়ের ঘোষণা, বিয়ের উপহারের তালিকা, চাকরির চেক।

অর্থাৎ এক ধরনের জীবন শেষ হয়ে আরেকটি জীবন শুরু হয়েছে।

লেখাটি কোথাও উচ্চস্বরে অভিযোগ তোলে না। বরং খুব নীরবে দেখায়, কীভাবে একটি সমাজ নারীদের সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে গৃহস্থ জীবনের ভেতরে আটকে ফেলেছিল। মেরি হয়তো অসুখী ছিলেন না। কিন্তু তার শিল্পীসত্তা যে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়েছিল, সেটি স্পষ্ট।

তবু সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ আসে জীবনের শেষ অধ্যায়ে। আলঝেইমারে আক্রান্ত অবস্থায়ও তিনি তার প্রিয় গান “আভে মারিয়া” ভুলে যাননি। রাতের নার্সদের জন্য গান গাইতেন। স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সংগীত থেকে যাচ্ছিল।

এখানেই লেখাটি এক অসাধারণ মানবিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। কারণ এটি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয়ের গভীরে কিছু জিনিস এত শক্তভাবে গেঁথে থাকে যে সময়, রোগ, বার্ধক্য—কিছুই সেগুলো পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না।

পুরোনো স্ক্র্যাপবুকটি তাই কেবল পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন নয়। এটি এক নারীর অসম্পূর্ণ শিল্পীজীবনের দলিল, এক প্রজন্মের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন, এবং একই সঙ্গে সন্তানের চোখে মাকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প।

আমরা সবাই হয়তো কোনো না কোনোভাবে এমন মানুষদের সঙ্গে বাস করি, যাদের অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। একটি পুরোনো ছবি, চিঠি, ডায়েরি কিংবা স্ক্র্যাপবুক হঠাৎ সেই অজানা মানুষটিকে সামনে নিয়ে আসে। তখন বুঝতে পারি—মা কিংবা বাবা হওয়ার বহু আগে, তারা নিজেরাও ছিল স্বপ্নে ভরা তরুণ মানুষ।

জনপ্রিয় সংবাদ

আসিয়ান জ্বালানি সংকটে তড়িঘড়ি তেল ভাগাভাগি চুক্তির পথে, হরমুজ ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ

মায়ের হারানো স্ক্র্যাপবুক আর স্মৃতির ভেতরে ফিরে দেখা

০৭:৪৯:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

মানুষের জীবনে এমন কিছু বস্তু থাকে, যেগুলো কেবল জিনিস নয়—সেগুলো সময়ের ভেতরে আটকে থাকা একেকটি দরজা। বহু বছর পরে হঠাৎ খুলে গেলে সেই দরজা শুধু অতীতকে মনে করায় না, বরং নতুন করে চিনতে শেখায় সেই মানুষদের, যাদের আমরা খুব কাছ থেকে দেখেও পুরোপুরি কখনও চিনিনি। একটি পুরোনো স্ক্র্যাপবুকও তেমনই হতে পারে।

একজন ছেলের কাছে তার মায়ের পুরোনো স্ক্র্যাপবুক হয়ে উঠেছিল ঠিক সেই রকম এক টাইম মেশিন। ধুলোমাখা, প্রায় ভেঙে পড়া পাতাগুলোয় ছিল ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের ছোট ছোট সংবাদপত্রের কাটিং, ছবি, হাতে লেখা নোট, অনুষ্ঠানের ঘোষণা, প্রতিযোগিতার ফলাফল। আর সেই সবকিছুর কেন্দ্রে ছিলেন এক তরুণী—মেরি। যাকে পরে সবাই মা হিসেবে চিনেছে, কিন্তু এই স্ক্র্যাপবুকে তিনি সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ।

আমরা সাধারণত বাবা-মাকে দেখি তাঁদের পরিণত বয়সের ভেতর দিয়ে। তাঁরা আমাদের জন্য দায়িত্বশীল, সংযত, অভিভাবকসুলভ। কিন্তু তাঁদেরও তো একসময় আলাদা স্বপ্ন ছিল, আলাদা উত্তেজনা ছিল, ছিল নিজের পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা। সন্তানরা খুব কমই সেই মানুষটিকে জানতে পারে।

এই লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক এখানেই—এটি কেবল একজন মায়ের স্মৃতিচারণ নয়, বরং এক নারীর হারিয়ে যাওয়া আত্মপরিচয়কে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা।

স্ক্র্যাপবুকের প্রথম কাটিংয়ে দেখা যায়, মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক ইতালীয়-আমেরিকান কিশোরী গান গাইছে স্থানীয় প্রতিযোগিতায়। এরপরের পাতাগুলোয় ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে তার বেড়ে ওঠা। কোথাও চার্চের অনুষ্ঠানে গান, কোথাও রেড ক্রসের শো, কোথাও স্থানীয় থিয়েটারের প্রতিযোগিতা। একসময় সে পুরস্কারও জিতছে। দর্শকরা তার কণ্ঠে মুগ্ধ হচ্ছে। সংবাদপত্রে তার সৌন্দর্য, তার কণ্ঠ, তার উপস্থিতি নিয়ে লেখা হচ্ছে।

এই সবকিছু পড়তে পড়তে লেখক বুঝতে পারেন—তার মা শুধু সংসারী নারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন শিল্পীও। হয়তো বড় মাপের খ্যাতি তার নাগালে আসেনি, কিন্তু তার নিজের ছোট জগতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল এক উপস্থিতি।

Vintage Scrapbook Album- Memories of my Mother - Glitter & Glam made by Pam

এই উপলব্ধির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি গভীর বেদনা। কারণ আমরা জানি, সেই সময়ের আমেরিকায় মধ্যবিত্ত নারীদের জীবন কীভাবে গড়ে উঠত। বিয়ে, সংসার, সন্তান—এসবের পর ব্যক্তিগত স্বপ্নের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যেত। মেরির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। স্ক্র্যাপবুকের শেষের দিকে আর মঞ্চের খবর নেই; আছে বিয়ের ঘোষণা, বিয়ের উপহারের তালিকা, চাকরির চেক।

অর্থাৎ এক ধরনের জীবন শেষ হয়ে আরেকটি জীবন শুরু হয়েছে।

লেখাটি কোথাও উচ্চস্বরে অভিযোগ তোলে না। বরং খুব নীরবে দেখায়, কীভাবে একটি সমাজ নারীদের সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে গৃহস্থ জীবনের ভেতরে আটকে ফেলেছিল। মেরি হয়তো অসুখী ছিলেন না। কিন্তু তার শিল্পীসত্তা যে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়েছিল, সেটি স্পষ্ট।

তবু সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ আসে জীবনের শেষ অধ্যায়ে। আলঝেইমারে আক্রান্ত অবস্থায়ও তিনি তার প্রিয় গান “আভে মারিয়া” ভুলে যাননি। রাতের নার্সদের জন্য গান গাইতেন। স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সংগীত থেকে যাচ্ছিল।

এখানেই লেখাটি এক অসাধারণ মানবিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। কারণ এটি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয়ের গভীরে কিছু জিনিস এত শক্তভাবে গেঁথে থাকে যে সময়, রোগ, বার্ধক্য—কিছুই সেগুলো পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না।

পুরোনো স্ক্র্যাপবুকটি তাই কেবল পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন নয়। এটি এক নারীর অসম্পূর্ণ শিল্পীজীবনের দলিল, এক প্রজন্মের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন, এবং একই সঙ্গে সন্তানের চোখে মাকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প।

আমরা সবাই হয়তো কোনো না কোনোভাবে এমন মানুষদের সঙ্গে বাস করি, যাদের অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই সীমিত। একটি পুরোনো ছবি, চিঠি, ডায়েরি কিংবা স্ক্র্যাপবুক হঠাৎ সেই অজানা মানুষটিকে সামনে নিয়ে আসে। তখন বুঝতে পারি—মা কিংবা বাবা হওয়ার বহু আগে, তারা নিজেরাও ছিল স্বপ্নে ভরা তরুণ মানুষ।