সুন্দরবনের গভীরে মধু আহরণে গিয়ে বনদস্যুদের কবলে পড়ে মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৩ মৌয়াল। তবে মুক্তি মিললেও তাদের ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। দস্যুদের নির্যাতন, লুটপাট এবং মুক্তিপণের বোঝা এখন নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে এসব বনজীবী পরিবারকে।
শনিবার বিকেলে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে নিজেদের বাড়িতে ফেরেন তারা। এর দুই দিন আগে বৃহস্পতিবার সকালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের বানিয়াখালি ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমতি নিয়ে দুটি নৌকায় করে মধু সংগ্রহে যান মৌয়ালরা। পরে বিকেলে শিবসা নদীসংলগ্ন কুমড়াখালি খাল এলাকায় বনদস্যুদের হাতে অপহৃত হন তারা।
মৌয়াল দলের সরদার আব্দুল গফুর গাজী জানান, সুন্দরবনে প্রবেশের পরপরই ওঁৎ পেতে থাকা ‘দুলাভাই বাহিনী’র সদস্যরা তাদের আটক করে গভীর বনের একটি খালে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের মারধর করা হয় এবং সঙ্গে থাকা নগদ ৪২ হাজার টাকা, জামাকাপড় ও মধু সংগ্রহের সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
পরে দস্যুরা লোকালয়ে থাকা তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে মৌয়ালদের পরিবারের কাছে খবর পাঠায়। প্রথমে দেড় লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরে দরকষাকষির মাধ্যমে বিকাশে ৩৬ হাজার টাকা পাঠানোর পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঋণ আর দাদনের বোঝা
অপহরণের শিকার মৌয়ালদের অধিকাংশই স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এসে তারা পড়েছেন নতুন সংকটে। একদিকে দস্যুদের হাতে সব হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে ঋণ শোধের চাপ।
আব্দুল গফুর গাজী বলেন, মহাজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে মধু সংগ্রহে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু বনদস্যুরা সবকিছু কেড়ে নেওয়ায় এখন পরিবার চালানো এবং দাদনের টাকা শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
মৌয়াল পরিমল সরকারও একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেন, নির্যাতনের ভয়ে নগদ টাকা সঙ্গে নিয়েও গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু দস্যুরা সেই টাকাও নিয়ে নেয়। পরে বাড়ি থেকেও মুক্তিপণের টাকা আদায় করা হয়। এখন পরিবার নিয়ে কিভাবে চলবেন এবং ঋণ শোধ করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন তারা।
হাসান মেম্বরকে ঘিরে অভিযোগ
অপহৃত মৌয়ালদের অভিযোগ, দুলাভাই বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় কিছু ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, আমাদি ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল হাসান ওরফে হাসান মেম্বর বনদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ করেন।
মৌয়াল হারুন গাজী বলেন, বনদস্যুরা মারধরের সময় জানতে চেয়েছিল কেন তারা হাসান মেম্বরকে টাকা না দিয়ে বনে প্রবেশ করেছেন। তার দাবি, হাসান মেম্বর বনদস্যুদের অস্ত্র, গুলি ও খাবার সরবরাহ করেন।
একই অভিযোগ করেন মৌয়াল খোকন মণ্ডলও। তিনি বলেন, দস্যুরা অস্ত্র কেনার জন্য বিপুল অর্থের চুক্তি করেছে এবং সেই টাকা তুলতেই বনজীবীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
মৌয়ালদের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসান মেম্বরের সহযোগী হিসেবে বিপুল মণ্ডল নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি কাজ করেন। তিনি বনদস্যুদের জন্য খাবার পৌঁছে দেওয়া এবং লুট করা মধু পরিবহনের কাজ করেন বলেও দাবি করেন তারা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবুল হাসান। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে তার নাম ব্যবহার করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বন বিভাগের বক্তব্য
সুন্দরবনের বানিয়াখালি ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, শনিবার ১৩ জন মৌয়াল দুটি নৌকায় করে সুন্দরবন থেকে ফিরে এসেছেন। তারা বনদস্যুদের কবলে পড়েছিলেন বলে জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
সুন্দরবনে মৌয়াল অপহরণ, মুক্তিপণ ও বনদস্যু আতঙ্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনায় বনজীবীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















