০৭:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন, কিন্তু দিল্লির সামনে বিকল্প কতটা?

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি সহজ ছিল না। কখনো সহযোগিতা, কখনো দূরত্ব, আবার কখনো কৌশলগত অংশীদারত্ব—দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরেই নানা ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, দুই দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভারতের নির্ভরতা অনেক বেশি, আর এই অসম সম্পর্কই আলোচনার ভিত্তি নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এখন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ যায় আমেরিকায়। একই সঙ্গে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের সবচেয়ে বড় বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ বছরে ৩২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ভারতীয় শেয়ারবাজারেও বড় ভূমিকা রয়েছে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ধাক্কা সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এই অসম বাস্তবতাই বাণিজ্য আলোচনায় ওয়াশিংটনকে বাড়তি সুবিধা দেয় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রযুক্তি খাতের উত্থান ও ভারতীয় প্রবাসীদের ভূমিকা

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উত্থান অনেকটাই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের ফল। স্বাধীনতার পর জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে গড়ে ওঠা আইআইটি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া বহু প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ পরে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখানে প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। এই প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ই পরবর্তীতে দুই দেশের সম্পর্কের একটি শক্ত ভিত তৈরি করে।

এরপর ২০০০ সালের আগে ‘ওয়াই টু কে’ সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যক সফটওয়্যার প্রকৌশলীর চাহিদা তৈরি হয়। ইংরেজিতে দক্ষ ও তুলনামূলক কম খরচের ভারতীয় প্রযুক্তিবিদরা তখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর বড় ভরসা হয়ে ওঠেন। সেই সময় থেকেই ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাত বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ভারতের আইটি ও ব্যবসায়িক সেবা রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার।

A relationship of unequals: US-India trade ties & twists

বাণিজ্য ঘাটতি ও ট্রাম্পের কৌশল

১৯৯০ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। তবে এই বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ঘাটতি প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও সেবা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে মোট ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ওয়াশিংটন মূলত পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক উন্নত অর্থনীতিগুলো মূলত সেবাখাতনির্ভর হলেও রাজনৈতিক কারণে পণ্য ঘাটতির বিষয়টিই বেশি আলোচনায় আসে। ভারত এই যুক্তি যথেষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি বলেও মত দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সম্পর্ক আরও বেশি লেনদেনভিত্তিক হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে ভারতকে জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। ভারত পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে এবং কিছু কৃষিপণ্যে শুল্ক কমানোর কথাও জানিয়েছে।

সম্পর্কে কৌশলগত বাস্তবতা

প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ভারত চাইলে কিছু খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কঠিন করতে পারে বা বিকল্প বাণিজ্য জোটের দিকে এগোতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো বড় পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কারণ, ভারতের রপ্তানি আয়, সেবা খাতের আয়, প্রবাসী আয় ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরাসরি প্রতিশোধমূলক অবস্থানের বদলে দিল্লি আপাতত ধৈর্যশীল আলোচনার পথই বেছে নিয়েছে।

বিশ্লেষণের শেষ অংশে মির্জা গালিবের একটি কবিতার উদ্ধৃতি টেনে বলা হয়েছে, সম্পর্কের বাস্তবতা অনেক সময় মর্যাদার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। আর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিও যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন বাস্তবতায় ভারতের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন, কিন্তু দিল্লির সামনে বিকল্প কতটা?

০৬:৩৮:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি সহজ ছিল না। কখনো সহযোগিতা, কখনো দূরত্ব, আবার কখনো কৌশলগত অংশীদারত্ব—দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরেই নানা ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, দুই দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভারতের নির্ভরতা অনেক বেশি, আর এই অসম সম্পর্কই আলোচনার ভিত্তি নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এখন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ যায় আমেরিকায়। একই সঙ্গে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের সবচেয়ে বড় বাজারও যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ বছরে ৩২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ভারতীয় শেয়ারবাজারেও বড় ভূমিকা রয়েছে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ধাক্কা সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। এই অসম বাস্তবতাই বাণিজ্য আলোচনায় ওয়াশিংটনকে বাড়তি সুবিধা দেয় বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রযুক্তি খাতের উত্থান ও ভারতীয় প্রবাসীদের ভূমিকা

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উত্থান অনেকটাই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের ফল। স্বাধীনতার পর জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে গড়ে ওঠা আইআইটি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া বহু প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ পরে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখানে প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। এই প্রবাসী ভারতীয় সম্প্রদায়ই পরবর্তীতে দুই দেশের সম্পর্কের একটি শক্ত ভিত তৈরি করে।

এরপর ২০০০ সালের আগে ‘ওয়াই টু কে’ সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যক সফটওয়্যার প্রকৌশলীর চাহিদা তৈরি হয়। ইংরেজিতে দক্ষ ও তুলনামূলক কম খরচের ভারতীয় প্রযুক্তিবিদরা তখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর বড় ভরসা হয়ে ওঠেন। সেই সময় থেকেই ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাত বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ভারতের আইটি ও ব্যবসায়িক সেবা রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার।

A relationship of unequals: US-India trade ties & twists

বাণিজ্য ঘাটতি ও ট্রাম্পের কৌশল

১৯৯০ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। তবে এই বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ঘাটতি প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও সেবা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে মোট ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ওয়াশিংটন মূলত পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক উন্নত অর্থনীতিগুলো মূলত সেবাখাতনির্ভর হলেও রাজনৈতিক কারণে পণ্য ঘাটতির বিষয়টিই বেশি আলোচনায় আসে। ভারত এই যুক্তি যথেষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেনি বলেও মত দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সম্পর্ক আরও বেশি লেনদেনভিত্তিক হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে ভারতকে জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। ভারত পাল্টা ব্যবস্থা নেয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে এবং কিছু কৃষিপণ্যে শুল্ক কমানোর কথাও জানিয়েছে।

সম্পর্কে কৌশলগত বাস্তবতা

প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ভারত চাইলে কিছু খাতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কঠিন করতে পারে বা বিকল্প বাণিজ্য জোটের দিকে এগোতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো বড় পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কারণ, ভারতের রপ্তানি আয়, সেবা খাতের আয়, প্রবাসী আয় ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরাসরি প্রতিশোধমূলক অবস্থানের বদলে দিল্লি আপাতত ধৈর্যশীল আলোচনার পথই বেছে নিয়েছে।

বিশ্লেষণের শেষ অংশে মির্জা গালিবের একটি কবিতার উদ্ধৃতি টেনে বলা হয়েছে, সম্পর্কের বাস্তবতা অনেক সময় মর্যাদার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। আর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিও যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন বাস্তবতায় ভারতের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।