ফিলিপাইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতার্তেকে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দেশটির প্রতিনিধি পরিষদে এ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু হয়েছে, যেখানে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক ও ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়া শুধু বর্তমান ক্ষমতার লড়াইকেই নয়, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
ফিলিপাইনের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী দুটি পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। একদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফের্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের পরিবার, অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের পরিবার। সারা দুতার্তেকে ঘিরে চলমান অভিশংসন প্রক্রিয়াকে সেই সংঘাতের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের ইঙ্গিত
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদের ৩১৮ সদস্যের মধ্যে ২০০ জনেরও বেশি আইনপ্রণেতা সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী, অভিশংসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনই যথেষ্ট।
যদি প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস হয়, তাহলে বিষয়টি সিনেটে যাবে। সেখানেই হবে আনুষ্ঠানিক বিচার। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সিনেটে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পাওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
ম্যানিলার দে লা সাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক অ্যান্থনি লরেন্স বরহা বলেছেন, সারা দুতার্তের জনপ্রিয়তা এখনো অনেক শক্তিশালী। ফলে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে অপসারণ করা যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
গত বছরের ব্যর্থ অভিশংসন প্রচেষ্টা
এটি টানা দুই বছরে সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিশংসন উদ্যোগ। গত বছরও প্রতিনিধি পরিষদ তাকে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তবে ফিলিপাইনের সুপ্রিম কোর্ট পরে সেই সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আদালত বলেছিল, যথাযথ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
ফিলিপাইনের সংবিধানে একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক বছরে দুবার অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ নেই। ফলে দুতার্তের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নতুন করে অভিযোগ দাখিল করতে চলতি বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

যেসব অভিযোগের মুখে দুতার্তে
সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে গোপন তহবিল অপব্যবহার, অস্বাভাবিক সম্পদের মালিকানা, শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে ঘুষ নেওয়া এবং প্রেসিডেন্ট মার্কোস, তার স্ত্রী ও মার্কোসের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মার্টিন রোমুয়ালদেজকে হত্যার হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিশেষ করে হত্যার হুমকির বিষয়টি মার্কোস ও দুতার্তে পরিবারের সম্পর্কের চরম অবনতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। একসময় দুই পরিবার রাজনৈতিক মিত্র হলেও এখন তাদের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ চলছে।
এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয় ২০২৫ সালের মার্চে, যখন প্রেসিডেন্ট মার্কোস আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছে রদ্রিগো দুতার্তেকে হস্তান্তরের অনুমোদন দেন। মাদকবিরোধী অভিযানে সহিংসতার অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বর্তমানে নেদারল্যান্ডসে আটক রয়েছেন।
২০২৮ নির্বাচন নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা
সারা দুতার্তে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিনেটে দোষী সাব্যস্ত হলে তার সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে।
ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজের সহযোগী ডিন পাওলো তামাসে বলেছেন, সিনেট যদি তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্লেষক বরহার মতে, এই অভিশংসন বিচার দুতার্তে সমর্থকদের আরও সংগঠিত করতে পারে। তাদের কাছে এটি রাজনৈতিক নিপীড়নের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। আবার বিরোধী গোষ্ঠীগুলোও আশা করছে, বিচার প্রক্রিয়া দুতার্তে-বিরোধী জনমতকে আরও শক্তিশালী করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্লিভ আরগুয়েলেস মনে করেন, বহুল প্রচারিত এই বিচার প্রক্রিয়া বিশেষ করে মিন্দানাও অঞ্চলে দুতার্তে পরিবারের সমর্থন আরও বাড়াতে পারে। তার মতে, এই পরিস্থিতি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত ও অনিশ্চিত করে তুলছে।
ফিলিপাইনে সারা দুতার্তের অভিশংসন ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















