মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক প্রাকৃতিক রাবার বাজারে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সিনথেটিক রাবারের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, আর সেই সুযোগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক রাবারের দাম পৌঁছে গেছে প্রায় নয় বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানে। এতে সুবিধা পাচ্ছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো এশিয়ার বড় রাবার উৎপাদক দেশগুলো।
থাইল্যান্ডের বৃহত্তম রাবার উৎপাদক প্রতিষ্ঠান শ্রী ট্রাং অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রির প্রধান নির্বাহী ভিরাসিথ সিনচারেওনকুল জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে সরবরাহ ঝুঁকির আশঙ্কায় টায়ার নির্মাতা ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন অতিরিক্ত মজুত গড়ে তুলছে। সাধারণত যেখানে এক থেকে দুই মাসের রাবার মজুত রাখা হতো, এখন অনেক ক্রেতা তিন মাস পর্যন্ত মজুত রাখার পরিকল্পনা করছে।
সিনথেটিক রাবারের বদলে প্রাকৃতিক রাবারের দিকে ঝোঁক
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার কারণে পেট্রোলিয়ামভিত্তিক সিনথেটিক রাবারের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক রাবারের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে টায়ার ও গ্লাভস উৎপাদনে প্রাকৃতিক রাবার আংশিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, টিএসআর২০ গ্রেডের রাবারের ফিউচার মূল্য ৭ মে প্রতি কেজিতে ২ দশমিক ২২ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ। চলতি বছরের শুরু থেকেই এই দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে থাইল্যান্ডের আধিপত্য
ব্যাংক অব আয়ুধিয়ার গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। এর পরেই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, আইভরি কোস্ট ও ভিয়েতনাম। ওই বছর বিশ্বে মোট রাবার উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ মেট্রিক টন।
শ্রী ট্রাং অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি রাবার গাছের চাষ থেকে শুরু করে গ্লাভসের মতো চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে কাজ করে। ২০২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ১১ হাজার ৩৪০ কোটি বাত। তবে একই বছরে কোম্পানিটি লোকসানে পড়ে। তারপরও বর্তমান মূল্য পরিস্থিতি ধরে থাকলে মুনাফায় ফেরার আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

চীনের চাহিদা এখনও শক্তিশালী
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক রাবার ভোক্তা দেশ চীন। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক মোট চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশই এসেছে দেশটি থেকে। চীনের বিশাল টায়ার শিল্প এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার সম্প্রসারণ এর বড় কারণ। মিশেলিন, গুডইয়ার, ব্রিজস্টোনের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও দ্রুত উৎপাদন বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য উচ্চমানের টায়ার উৎপাদনে উন্নত মানের প্রাকৃতিক রাবারের চাহিদা আরও বাড়বে। কারণ বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির অতিরিক্ত ওজন ও উচ্চ গতির কারণে টায়ারে বেশি টর্ক ও ক্ষয় সহ্য করার সক্ষমতা প্রয়োজন হয়।
বাড়তে পারে টায়ারের দাম
রাবারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা। থাইল্যান্ডে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনাকারী একটি জাপানি টায়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্চ থেকেই তারা বাড়তি রাবার মূল্যের চাপ পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে টায়ারের খুচরা মূল্য বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে প্রতি কেজি রাবারের দাম ২ ডলারের ওপরে থাকাকে “স্বাস্থ্যকর” বলে মনে করছে শ্রী ট্রাং অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি। প্রতিষ্ঠানটি এ বছর বিক্রয় পরিমাণ ১৪ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ১৬ লাখ টনে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে প্রাকৃতিক রাবারের বাজারে বড় উত্থান, এশিয়ার উৎপাদকরা পাচ্ছে নতুন সুযোগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















