রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। মস্কোকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সেনা সহায়তা দিয়ে গত তিন বছরে দেশটি ৭০০ কোটি থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অর্থ উত্তর কোরিয়ার বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের কাছাকাছি।
দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অধীন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া বিপুল পরিমাণ রকেট আর্টিলারি, গোলাবারুদ এবং স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। বিশেষ করে কেএন-২৩ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ২৫০টি ইউনিট সরবরাহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব অস্ত্র উন্নয়নে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তাও পেয়েছে পিয়ংইয়ং।
সেনা পাঠিয়ে নতুন আয়ের উৎস
রাশিয়ার সঙ্গে ২০২৪ সালের জুনে কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি সইয়ের পর উত্তর কোরিয়া শুধু অস্ত্রই নয়, সেনাও পাঠাতে শুরু করে। দক্ষিণ কোরিয়ার এক আইনপ্রণেতার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার উত্তর কোরীয় বিশেষ বাহিনীর সদস্য ইউক্রেন সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে। তাদের পাশাপাশি প্রকৌশলী, ড্রোন অপারেটর ও ফায়ার সাপোর্ট ইউনিটও মোতায়েন আছে।
রুশ সরকার ২০২৪ সালের শরৎ থেকে এক বছরের কিছু বেশি সময়ে উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের জন্য ৬০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রত্যেক সেনা মাসে প্রায় ২ হাজার ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। নিহত সেনাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানিও কম নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। তবে দেশে ফিরে আসা সেনাদের জাতীয় বীর হিসেবে উপস্থাপন করছেন কিম জং উন। নিহত সেনাদের পরিবারের জন্য পিয়ংইয়ংয়ে বিলাসবহুল আবাসনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞা দুর্বল হয়ে পড়ছে
এক দশক আগে ধারাবাহিক পারমাণবিক পরীক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের কারণে জাতিসংঘ উত্তর কোরিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশেষ করে তেল আমদানি ও রপ্তানির ওপর কড়াকড়ি ছিল। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে অস্ত্র বাণিজ্যের ফলে সেই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের পর সর্বোচ্চ। গবেষক নাম জিন-উকের মতে, রাশিয়ায় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে উত্তর কোরিয়ার শিল্প কাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পিয়ংইয়ংয়ে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা
যুদ্ধ অর্থনীতির প্রভাব রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের শরতে শহরটি সফর করা এক সূত্র জানিয়েছে, আগের তুলনায় রাস্তায় বিলাসবহুল গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যক্তিগত নম্বরপ্লেটযুক্ত জাপানি ও ইউরোপীয় গাড়িও চোখে পড়ছে।
তবে এই অর্থনৈতিক সুবিধা দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছেছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। রাজধানীকেন্দ্রিক এই প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনমান কতটা বদলাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে অস্ত্র ও সেনা সহায়তা দিয়ে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















