মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর এল নিনোর খরার আশঙ্কা মিলিয়ে ফিলিপাইনের ধানচাষ এখন বড় সংকটে পড়েছে। জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সার খরচের চাপ এবং ঋণের বোঝায় দেশটির ছোট কৃষকেরা টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনকে সরাসরি আঘাত করেছে।
ফিলিপাইনের পাম্পাঙ্গা অঞ্চলের কৃষক এলভিরা ফাদ্রিকুয়েলান তিন দশকের বেশি সময় ধরে ধানচাষ করছেন। আগে বাড়ির পাশের জমি নিরাপত্তার প্রতীক ছিল, এখন সেটিই তাঁর ঋণের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মৌসুমে তিনি ও তাঁর ছেলে মাত্র ২৫ হাজার পেসো আয় করেছেন, অথচ চাষ শুরু করতে কয়েক মাস আগেই খরচ হয়েছিল ২৭ হাজার পেসো। ডিজেলের দাম বাড়ার আগে কিনতে পেরেছিলেন বলেই কিছুটা রক্ষা।
এল নিনো ও যুদ্ধের প্রভাব
ফিলিপাইনের কৃষি বিভাগ আশঙ্কা করছে, সরকারি হস্তক্ষেপ না হলে এল নিনো ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশটির ধান উৎপাদন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে উৎপাদন প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনে নেমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম কারণ সারের মূল্যবৃদ্ধি।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছায়। আমদানিনির্ভর ফিলিপাইনের জন্য এর প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক। অনেক অঞ্চলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৫০ থেকে ৭০ পেসো থেকে বেড়ে ১৩০ পেসো পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে সেচ, চাষাবাদ ও পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়ে গেছে।
ঋণ, লোকসান ও কৃষকের হতাশা
আরেক কৃষক মেরি কাস্ত্রো জানিয়েছেন, সর্বশেষ ফসল থেকে ৮০ হাজার পেসো আয় হলেও ঋণ পরিশোধের পর হাতে ছিল মাত্র ২০ হাজার পেসো। তিনি চান না তাঁর চার সন্তানের কেউ কৃষিকাজে আসুক। তাঁর এক ছেলে ইতোমধ্যে যন্ত্র প্রকৌশল পড়ছে।
এদিকে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত খরার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। খরাপ্রবণ জমিতে সেচ দিতে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করতে হয়, আর তার জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত জ্বালানি। কৃষকদের ভাষায়, এটি এক ধরনের “দ্বিগুণ আঘাত”।

মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সংকটের শঙ্কা
দেশটির মূল্যস্ফীতি এপ্রিল মাসে ৭ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের মাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ। একই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
একটি উন্নয়ন সংস্থার প্রধান সনি আফ্রিকা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ফিলিপাইনের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের মূল্যচাপ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, উৎপাদন ব্যয় দীর্ঘদিন বেশি থাকলে স্থানীয় ঘাটতি জাতীয় খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। এতে বহু কৃষক নতুন করে দারিদ্র্যের মুখে পড়বেন।
সরকারি সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন
সংকট সামাল দিতে মার্চে ৫ কোটি পেসোর জ্বালানি ভর্তুকি ঘোষণা করে কৃষি বিভাগ। যান্ত্রিক সরঞ্জাম ব্যবহারকারী ৯ হাজারের বেশি কৃষককে ৫ হাজার পেসো করে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এছাড়া কৃষক ও জেলেদের জন্য ১০ বিলিয়ন পেসোর নগদ সহায়তা কর্মসূচিও চালু করা হয়।
তবে অনেক কৃষকের অভিযোগ, এই সহায়তা এখনো তাদের কাছে পৌঁছায়নি। উপকারভোগীর তালিকায় দূরবর্তী অঞ্চলের অনেক কৃষকের নামই নেই। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, সার্বজনীন ভর্তুকির বদলে প্রকৃত দরিদ্র কৃষকদের লক্ষ্য করে সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর হবে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবছেন। এলভিরা ফাদ্রিকুয়েলানের মতে, সৌরশক্তিচালিত সেচব্যবস্থা ভবিষ্যতে কৃষকদের আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের অস্থিরতা থেকে কিছুটা রক্ষা করতে পারে। কিন্তু আপাতত সেই সম্ভাবনা এখনও দূরের স্বপ্ন।
ফিলিপাইনের ধানচাষে জ্বালানি সংকট ও এল নিনো
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও এল নিনোর প্রভাবে ফিলিপাইনের ধানচাষে জ্বালানি খরচ ও উৎপাদন সংকট তীব্র হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















