বিনিয়োগের পরামর্শ নিতে এখন অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো এআই মডেল দ্রুত উন্নত হওয়ায় অনেকের বিশ্বাস, এগুলো হয়তো ব্যক্তিগত আর্থিক উপদেষ্টার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এআই কি সত্যিই নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ পরামর্শ দিতে পারে?
সম্প্রতি এক পরীক্ষামূলক অভিজ্ঞতায় একজন সাংবাদিক চ্যাটজিপিটিকে নিজের আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে ব্যবহার করেন। উদ্দেশ্য ছিল দেখতে, এআই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারে। পরে বাস্তব আর্থিক উপদেষ্টারাও সেই পরামর্শ মূল্যায়ন করেন।
পরীক্ষায় কাল্পনিকভাবে এক মিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও তৈরি করা হয়। বিনিয়োগকারীর বয়স ধরা হয় ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে, মূল লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি, আর ঝুঁকি গ্রহণের মাত্রা মাঝারি। চ্যাটজিপিটি পরামর্শ দেয় মার্কিন শেয়ারবাজার, আন্তর্জাতিক শেয়ার, বন্ড, রিয়েল এস্টেট ও নগদ অর্থ—এই পাঁচ ভাগে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিতে।
এআইয়ের প্রস্তাবে ছিল বড় মার্কেটভিত্তিক ইটিএফ, প্রযুক্তিনির্ভর গ্রোথ ফান্ড, ডিভিডেন্ড শেয়ার, আন্তর্জাতিক বাজার এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ট্রেজারি ও টিপস বন্ড। তবে বাস্তব আর্থিক উপদেষ্টারা বলেন, পরিকল্পনাটি মোটের ওপর গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি ও ভুল ছিল। এমনকি শুরুতেই চ্যাটজিপিটি সাধারণ গাণিতিক ভুলও করে, ফলে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি অর্থ নগদ হিসেবে রেখে দেয়।
অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতির অধ্যাপক অ্যান্ড্রু লো বলেন, এআইকে দক্ষ কিন্তু সবসময় সঠিক নয়—এমন এক সহকারীর মতো ভাবা উচিত। তাই এর প্রতিটি পরামর্শ যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও ইরান যুদ্ধের সময় বাজারে ধস নামলে চ্যাটজিপিটি আবারও কিছু কৌশলগত পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়। আন্তর্জাতিক শেয়ারের অংশ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি-সুরক্ষা সম্পদ বাড়ানোর কথা বলা হয়। কিন্তু বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরামর্শ মূলত বাজারের সময় ধরার চেষ্টা, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্ক উত্তেজনার সময়ও এআই কিছু নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ার কেনার পরামর্শ দেয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, সেই শেয়ারগুলোর রিটার্ন সামগ্রিক বাজারের তুলনায় কম ছিল। অর্থাৎ খবর সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলেও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত সবসময় সফল হয়নি।
আরও উদ্বেগ তৈরি হয় লিভারেজড ইটিএফ নিয়ে আলোচনায়। প্রথমে চ্যাটজিপিটি এসব পণ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করলেও পরে ব্যবহারকারীর আগ্রহ দেখে ধীরে ধীরে সেগুলো কেনাবেচার কৌশলও ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই বড় সমস্যা। কারণ এআই প্রায়ই ব্যবহারকারীর মনোভাবের সঙ্গে মানিয়ে এমন পরামর্শ দেয়, যা বাস্তবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলেহান্দ্রো লোপেজ-লিরার মতে, এআই মডেল অনেক সময় অতিরিক্ত ‘সহমত’ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ ব্যবহারকারী যা শুনতে চান, সেটিই বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে এআই আরও উন্নত হবে এবং একসময় হয়তো বিশ্বস্ত আর্থিক উপদেষ্টার ভূমিকাও নিতে পারবে। কিন্তু এখনো সেই পর্যায় আসেনি। তাই বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু একমাত্র ভরসা হিসেবে নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















