মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত ভাসমান কারাগারে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, অবরোধ ও সামরিক উত্তেজনার কারণে শত শত জাহাজ সেখানে আটকে পড়েছে। হাজার হাজার নাবিক দিন গুনছেন মুক্তির আশায়। খাবার ও পানির মজুত ফুরিয়ে আসছে, চিকিৎসাসেবা নেই, আর প্রতিদিনই ড্রোন হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র আতঙ্কে কাটছে তাদের জীবন।
বাংলাদেশি নাবিক শামীম সাব্বিরও এমনই এক আটকে পড়া জাহাজে রয়েছেন। চীনের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজে কর্মরত এই নেভিগেশন কর্মকর্তা টানা দুই মাসের বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালীতে আটকে আছেন। তার ভাষায়, পরিস্থিতি এখন “খুবই ভয়াবহ” হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের মাঝখানে নাবিকদের বন্দিজীবন
প্রতিদিন ভোরে জাহাজের ব্রিজে দাঁড়িয়ে ইরানি নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাব্বির। একই প্রশ্ন বারবার করতে হয়—কবে তারা প্রণালী ছেড়ে যেতে পারবেন। কিন্তু উত্তর আসে একই ধরনের, এলাকা এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক।
একদিকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন টহল—এই সংঘাতের মাঝখানে আটকে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার নাবিক। কেউ কেউ খাবার ও পানির শেষ মজুত ব্যবহার করছেন, কেউ আবার আহত অবস্থায় চিকিৎসাহীন দিন কাটাচ্ছেন।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালী এখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় জাহাজগুলো কার্যত চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ৮০০-র বেশি জাহাজ প্রণালী ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে খুব কম জাহাজই বের হতে পারছে।
খাবার সংকট ও আতঙ্কের জীবন
আটকে পড়া নাবিকদের অনেকেই এখন সীমিত খাবার ভাগ করে খাচ্ছেন। কোথাও শুধু ভাত আর পানি দিয়ে দিন চলছে, কোথাও আবার ইনস্ট্যান্ট নুডলস, গাজর আর বাঁধাকপিই শেষ ভরসা।
কিছু জাহাজে অসুস্থ নাবিকদের অবস্থা গুরুতর হয়ে উঠেছে। একজন ভারতীয় নাবিক রেডিওতে সাহায্য চেয়ে জানিয়েছেন, তাদের জাহাজে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি শেষ হয়ে গেছে। দুই ক্রু সদস্য সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন। অন্যদিকে এক রুশ নাবিক জানিয়েছেন, তার উচ্চ রক্তচাপের ওষুধও আর নেই।
নাবিকদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক এখন ড্রোন হামলা। আকাশজুড়ে ইরানি ড্রোনের শব্দ তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। অনেক জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ১০ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩০টির বেশি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।

উদ্ধার প্রচেষ্টা থমকে গেছে
মার্কিন বাহিনী একসময় “প্রজেক্ট ফ্রিডম” নামে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মাথায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নাবিকদের আশা আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে।
এদিকে বীমা খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জাহাজমালিক তাদের জাহাজ সরাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। একটি বড় তেলবাহী জাহাজের জন্য বীমা ব্যয় এখন কয়েক মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে আর্থিক সংকটে পড়া মালিকদের সঙ্গে ক্রুদের বিরোধও বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বলছে, তারা ইতিমধ্যে দুই হাজারের বেশি সহায়তার আবেদন পেয়েছে। এর মধ্যে বহু আবেদন এসেছে বেতন, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট নিয়ে। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক সামুদ্রিক ইতিহাসে এমন পরিস্থিতির নজির খুব কম।
স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা
চরম অনিশ্চয়তার মাঝেও নাবিকরা মানসিকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। কেউ টেবিল টেনিস খেলছেন, কেউ সিনেমা দেখে সময় কাটাচ্ছেন। কেউ ধর্মীয় বই পড়ছেন, আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশি নাবিক সাব্বির রাতের দিকে কখনো কখনো পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। স্ত্রী ও বাবা-মায়ের সঙ্গে সংযোগই এখন তার সবচেয়ে বড় মানসিক ভরসা। আর অবসরে সহকর্মীদের নিয়ে দেখছেন সমুদ্রভিত্তিক পুরোনো সিনেমা।
তবে প্রতিদিনের বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। রেডিওতে পাশের জাহাজগুলোর সাহায্যের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। কোথাও পানি নেই, কোথাও খাবার শেষ। আর সবাই অপেক্ষা করছে কখন এই অচলাবস্থা শেষ হবে।
হরমুজ প্রণালীতে আটকে নাবিক সংকট
হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ ও অবরোধে আটকে পড়া হাজারো নাবিক খাদ্য, পানি ও নিরাপত্তা সংকটে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















