দেশের প্রায় প্রতি সাতজনের একজন মানুষ ২০২৫ সালে ব্র্যাকের বিভিন্ন সেবা ও সহায়তার আওতায় এসেছে। সংস্থাটির প্রকাশিত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত এক বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ব্র্যাকের সহায়তা পেয়েছেন। এর মধ্যে ১ কোটি ৯০ লাখ নারী এবং ২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, দুর্যোগ মোকাবিলা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন এবং দক্ষতা উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে এসব সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার ঢাকার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বার্ষিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়েছে ব্র্যাক। একই সঙ্গে প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি পূরণ এবং অতি দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী ও যুবসমাজকে অগ্রাধিকার
আসিফ সালেহ্ বলেন, আগামী দিনের কার্যক্রম পাঁচটি মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে নারী ও যুবসমাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রান্তিক মানুষের কাছে আগে পৌঁছানো, সরকারের সঙ্গে যৌথ সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং সমাজের অংশ হয়ে কাজ করা। তিনি আরও বলেন, পরিবর্তিত সমাজ ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানসিক স্বাস্থ্য, ডে-কেয়ার সেন্টার, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় অগ্রগতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ, আল্ট্রা-পুওর গ্র্যাজুয়েশন এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের আয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে ব্র্যাক। গত পাঁচ বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সম্পদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ৩ লাখ ১২ হাজার অতিদরিদ্র পরিবার দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। একই সময়ে মোট ঋণ সহায়তার পরিমাণ ২৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। নারী উদ্যোক্তা তৈরি এবং কৃষি সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সম্প্রসারণ
কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া এবং অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কাজ করছে ব্র্যাক। গত পাঁচ বছরে ২১ লাখ মা নিরাপদ প্রসবসেবা পেয়েছেন। ১০ লাখের বেশি যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। পাশাপাশি ৩৫ লাখ মানুষের অসংক্রামক ব্যাধি, প্রতিবন্ধিতা ও চোখের সমস্যা শনাক্ত করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে গত পাঁচ বছরে ৬ লাখ ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী ব্র্যাকের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে, যাদের ৫৬ শতাংশ ছাত্রী। এছাড়া ১ হাজার ৭৪০টি স্কুলে ৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাত ধোয়ার সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রান্তিক ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের জন্য শিক্ষা, পুষ্টি ও মানসিক সহায়তা সমন্বিতভাবে দেওয়ার পরিকল্পনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জলবায়ু ও নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্ব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১১ লাখ দুর্যোগকবলিত পরিবার মানবিক সহায়তা পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ১ লাখ ৩৩ হাজার পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং এক লাখের বেশি মানুষ জলবায়ুসহিষ্ণু প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ পানি পেয়েছেন।

নারী ও কিশোরীদের নেতৃত্ব বিকাশ, আইনি সহায়তা এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ব্র্যাক। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৯৮ হাজার ৬০০ নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত ও আইনি সহায়তা পেয়েছে। ২০২৫ সালে অংশগ্রহণকারীদের উদ্যোগে ২ হাজার ২৩৭টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে।
আগামী দিনের পরিকল্পনায় ব্র্যাক জানিয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি চর, হাওর, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় এলাকায় নতুন আর্থিক সেবাকেন্দ্র চালু এবং ৩৯ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















