ভারতের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই সরকারের প্রত্যাশামতো আচরণ করে। গত এক দশক ধরে সরকার চেয়েছে বেসরকারি খাত আরও বেশি বিনিয়োগ করুক, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
সম্প্রতি ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি. অনন্ত নাগেশ্বরন বলেছেন, মহামারির পর থেকে দেশের শীর্ষ ৫০০ তালিকাভুক্ত কোম্পানির মুনাফা বছরে ৩০ শতাংশের বেশি হারে বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় বেসরকারি খাতের মূলধনী বিনিয়োগ হতাশাজনকভাবে কম।
তিনি একা নন। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনও বারবার প্রশ্ন তুলেছেন—করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কেন বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে না? সরকার কর কমিয়েছে, ব্যাংক খাতের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, ভোক্তা ব্যয় বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করেছে। তারপরও ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
সরকারের উদ্বেগ অমূলক নয়। কারণ বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণও সম্ভব নয়।
ভারতের নীতিনির্ধারকেরা সঠিকভাবেই বুঝেছেন যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় বাধা হলো কম বিনিয়োগ। তবে কেন এই সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি তারা এখনও পুরোপুরি ধরতে পারেননি। এক দশকেরও বেশি আগে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় মূলধনী ব্যয় ৪০ শতাংশের ওপরে ছিল। এখন তা গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে।
এই হিসাবের মধ্যেও সরকারি বিনিয়োগের অংশ ক্রমেই বেড়েছে। বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে আগ্রহ কমে যাওয়ায় সরকার নিজেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেছে। ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদনমুখী মোট বিনিয়োগ এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
সাম্প্রতিক কয়েক প্রান্তিকে ভারতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু তার পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল করছাড় ও সীমিত মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়তি ভোক্তা ব্যয়। সেই গতি এখন ধীরে ধীরে কমছে।
তবু সরকার এখনও বুঝতে পারছে না কেন বেসরকারি খাত মূলধনী বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছে।
নাগেশ্বরনের ব্যাখ্যা অনেকটা নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ী উত্তরাধিকারীদের দিকে আঙুল তোলে। তার মতে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের মালিকেরা মুনাফা জমিয়ে রাখছেন, বাস্তব খাতে বিনিয়োগ না করে বিদেশে পারিবারিক বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তুলছেন।
![]()
সরকারি মহলে এমন হতাশা স্পষ্ট। গত বছর নির্মলা সীতারামনও অভিযোগ করেছিলেন, ভারতের করপোরেট খাত “নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগযোগ্য তহবিল” জমিয়ে রাখছে, কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণে এগোচ্ছে না।
ভারতের বড় ব্যবসাগুলোর পারিবারিক কাঠামো অনেক সময় নিরাপদ অবস্থান ধরে রাখতে উৎসাহিত করে। ফলে ঝুঁকি নিয়ে নতুন উদ্যোগে যাওয়ার বদলে তারা স্থিতিশীলতা বেছে নেয়। অন্যান্য গতিশীল অর্থনীতিতে পারিবারিক ব্যবসাগুলো প্রজন্মান্তরে টিকে থাকার লড়াইয়ে থাকে। কিন্তু ভারতের তুলনামূলকভাবে বন্ধ ও সীমিত উদ্যোক্তা পরিবেশে নতুন প্রজন্মের ওপর সেই চাপ কম।
তবে এটিই পুরো সত্য নয়।
আসল সমস্যা আরও গভীরে। ভারতের ধনী ব্যবসায়ীরা এখন দেশীয় রাজনৈতিক ঝুঁকিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, যে কোনো সময় অপ্রত্যাশিত করের বোঝা চাপতে পারে অথবা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের শিকার হতে পারেন। ফলে ভারতে লাভ করলেও তারা সেই অর্থের একটি অংশ বিদেশে সরিয়ে নিতে চান, যাতে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ থেকে কিছুটা দূরে থাকা যায়।
এই অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৫ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু একই সময়ে ৪ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার মুনাফা বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর বিদেশমুখী বিনিয়োগও ছিল ২ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।
যদি ভারতের নিজস্ব ধনী ব্যবসায়ীরাই দেশে পুনঃবিনিয়োগে আগ্রহ না দেখান, তাহলে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন পূর্ণ আস্থা রাখবে?
নীতিনির্ধারকেরা বারবার জানতে চাইছেন কেন ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন না। কিন্তু তারা যে উত্তর পাচ্ছেন, সেটি মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করছেন। করছাড় ও প্রণোদনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু করপোরেট খাত আসলে চায় প্রশাসনিক, বিচারিক ও রাজনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতা। তারা ভয়মুক্ত পরিবেশ চায়। তারা এমন অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় যে তাদের ব্যবসা ও স্বাধীনতা পুরোপুরি দিল্লির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
সেই আস্থার পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত পুঁজি অপেক্ষা করতেই থাকবে। আর সেই পুঁজিকে ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারকে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের আরও বেশি স্বাধীনতা ও নিশ্চয়তা দিতে হবে।
মিহির শর্মা 


















