বিশ্ব বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি একসময় ছিল সমুদ্রপথের স্থিতিশীলতা। কয়েক দশক ধরে ধারণা ছিল, জাহাজ চলবে, বন্দর কাজ করবে, পণ্য পৌঁছাবে—আর বৈশ্বিক অর্থনীতি তার গতিতে এগিয়ে যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ সেই আত্মবিশ্বাসে গভীর ফাটল ধরিয়েছে। যুদ্ধটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকেই সামনে আনেনি; বরং দেখিয়ে দিয়েছে, বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থা কতটা পুরোনো, অরক্ষিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে আছে।
আজ বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। অথচ এই বিশাল ব্যবস্থার ভিত্তি এখনও এমন অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে, যা আধুনিক ঝুঁকির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বহু বন্দর এখনও বড় ও আধুনিক জাহাজ সামলানোর সক্ষমতা অর্জন করেনি। ফলে পণ্য খালাসে দেরি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বাণিজ্যিক জাহাজবহরের বড় অংশই পুরোনো। বহু জাহাজের বয়স ২০ বছরের বেশি, যেগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ বা সুরক্ষা ব্যবস্থাও আধুনিক নয়। এতে দুর্ঘটনা ও বিমা ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
সমস্যা শুধু অবকাঠামো বা জাহাজের নয়। পুরো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এখনও বিচ্ছিন্ন সফটওয়্যার, কাগজনির্ভর নথি এবং অদক্ষ সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তিগতভাবে পৃথিবী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের যুগে প্রবেশ করলেও আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পের বড় অংশ এখনও পুরোনো পদ্ধতিতে চলছে। এই বৈপরীত্য এখন আর শুধু অদক্ষতা নয়; এটি একটি বড় কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
ভূরাজনীতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। একসময়ের স্থিতিশীল সমুদ্রপথ এখন ক্রমশ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে চলে যাচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি কিংবা হরমুজ প্রণালি—সবকিছুই এখন শুধু বাণিজ্যপথ নয়, বরং সম্ভাব্য সংঘাতের অঞ্চল। জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে নিতে হচ্ছে, বিমা ব্যয় বাড়ছে, আর সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি এখনও মহামারির ধাক্কা পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি; তার ওপর যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক বিভাজন নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই বাস্তবতায় এশিয়ার গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্র এখন মূলত এশিয়া। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজশিল্প পুরো সামুদ্রিক অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। চীন একাই বিশ্বের অর্ধেক নতুন বাণিজ্যিক জাহাজ তৈরি করে। একই সঙ্গে বিশ্বের বহু গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ ও পরিচালনাও বাড়ছে। অর্থাৎ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও আধুনিকায়নে চীনের প্রভাব এখন গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।
তবে এই পরিবর্তনের অর্থ কেবল নতুন জাহাজ নির্মাণ নয়। পুরো ব্যবস্থাকে নতুনভাবে কল্পনা করতে হবে। “স্মার্ট পোর্ট” এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। স্বয়ংক্রিয় পণ্য খালাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লজিস্টিকস, রিয়েল-টাইম তথ্য আদানপ্রদান এবং সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের বন্দর নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

নিরাপত্তার প্রশ্নটিও নতুনভাবে ভাবতে হবে। বর্তমান সামুদ্রিক নেভিগেশন ব্যবস্থা মূলত জিপিএসের ওপর নির্ভরশীল, যা সহজেই ভুয়া সংকেত বা প্রযুক্তিগত হামলার শিকার হতে পারে। “শ্যাডো শিপিং” বা পরিচয় গোপন রেখে চলাচলকারী জাহাজও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ফলে শুধু নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ালেই হবে না; সাইবার নিরাপত্তা, রিয়েল-টাইম নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদার করতে হবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সম্ভবত অর্থায়ন। সামুদ্রিক খাতের আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগ দরকার, কিন্তু বৈশ্বিক পুঁজি এখন দ্রুত মুনাফার খাতে ঝুঁকছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা উন্নত প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের বেশি আকৃষ্ট করছে। ফলে জাহাজ ও বন্দর সংস্কারের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থ আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় সরকারগুলোর প্রণোদনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং যৌথ বিনিয়োগ মডেল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রপথকে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত বাস্তবতা হিসেবে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন আর বিষয়টি শুধু বাণিজ্যের নয়; এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা সমুদ্রপথের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই ভিত্তি যদি দুর্বল হয়, তবে এর প্রভাবও হবে বৈশ্বিক।
লেখক: জেমস ডেভিড স্পেলম্যান ওয়াশিংটনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনসের প্রধান।
জেমস ডেভিড স্পেলম্যান 



















