ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট-ইউজি ২০২৬ বাতিল করেছে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। পরীক্ষার আগে একটি কথিত ‘গেস পেপার’ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেওয়া এই পরীক্ষাকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ, ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কী ছিল সেই ‘গেস পেপার’?
রাজস্থান পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (এসওজি) জানিয়েছে, হাতে লেখা প্রায় ৪১০টি প্রশ্নের একটি নথি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, এর মধ্যে প্রায় ১২০টি প্রশ্ন মূল পরীক্ষার সঙ্গে মিলে গেছে।
সাধারণভাবে ‘গেস পেপার’ বলতে পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের একটি তালিকাকে বোঝায়। সাধারণত আগের বছরের প্রশ্ন, কোচিং উপকরণ, মক টেস্ট ও সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ভিত্তিতে এমন প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। বোর্ড পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এসবের প্রচলন দীর্ঘদিনের।
তবে তদন্তকারীরা বলছেন, এবারের ঘটনায় বিষয়টি কেবল সম্ভাব্য প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জীববিজ্ঞান ও রসায়ন অংশের বহু প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নপত্রের “অস্বাভাবিক মিল” পাওয়া গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এতে মোট ৭২০ নম্বরের মধ্যে প্রায় ৬০০ নম্বর পর্যন্ত প্রভাবিত হতে পারে।
এসওজির অতিরিক্ত মহাপরিচালক বিশাল বনসাল জানিয়েছেন, এই গেস পেপার পরীক্ষার অন্তত ১৫ দিন থেকে এক মাস আগেই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে। বিষয়টি এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
![]()
কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে প্রশ্নের নথি?
তদন্তে উঠে এসেছে, কেরালার একটি মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত চুরু এলাকার এক এমবিবিএস শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রথম এই নথি আসে। পরে সেটি রাজস্থানের সিকারে থাকা এক সহযোগীর কাছে পাঠানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, একটি পেইং গেস্ট আবাসনের মালিক সেখানে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এটি বিতরণ করেন। এরপর কোচিং নেটওয়ার্ক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে দ্রুত এটি ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তকারীরা উদ্ধার হওয়া চ্যাটে “forwarded many times” চিহ্নও পেয়েছেন।
পুলিশ সূত্রের দাবি, পরীক্ষার প্রায় ৪২ ঘণ্টা আগেই এই নথি বিভিন্ন গ্রুপে ঘুরতে শুরু করে। এমনকি পরীক্ষার দুই দিন আগে এটি ৫ লাখ রুপি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষার আগের দিন সেই মূল্য কমে প্রায় ৩০ হাজার রুপিতে নেমে আসে।
এই ঘটনায় ইতোমধ্যে উত্তরাখণ্ডের দেরাদুন এবং রাজস্থানের সিকার ও ঝুনঝুনু এলাকা থেকে ১৩ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।
ভারতের সবচেয়ে বড় ভর্তি পরীক্ষা
ভারতে এমবিবিএস, বিডিএস, বিএএমএস, বিএইচএমএস ও বিএইউএমএসসহ বিভিন্ন স্নাতক মেডিকেল কোর্সে ভর্তি হতে নিট-ইউজি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে এটিই ভারতের সবচেয়ে বড় ভর্তি পরীক্ষা।
২০২৬ সালের পরীক্ষা ৩ মে অনুষ্ঠিত হয়। দেশজুড়ে ৫৫১টি শহর এবং বিদেশের ১৪টি কেন্দ্রে প্রায় ২২ লাখ ৭৯ হাজার শিক্ষার্থী এতে অংশ নেয়। পরীক্ষা বিকেল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অফলাইন পদ্ধতিতে নেওয়া হয়েছিল।
এনটিএর দাবি ও তদন্ত
এনটিএ দাবি করেছে, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। প্রশ্নপত্র পরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকিং, ইউনিক ওয়াটারমার্ক, বায়োমেট্রিক যাচাই, এআই-নির্ভর সিসিটিভি মনিটরিং এবং ৫জি সিগন্যাল জ্যামার ব্যবহার করা হয়েছিল।
সংস্থাটি জানায়, পরীক্ষার চার দিন পর অর্থাৎ ৭ মে তারা অনিয়মের অভিযোগ পায়। এরপর ৮ মে বিষয়টি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়। শুরুতে এনটিএ সরাসরি “প্রশ্নফাঁস” শব্দ ব্যবহার না করলেও পরে ১২ মে পুরো পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















