ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে ঘিরে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। লেবার পার্টির ভেতর থেকেই তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হচ্ছে। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্টারমার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা শুরু হয়নি। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে, কারণ একের পর এক লেবার এমপি প্রকাশ্যে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ৮১ জন লেবার এমপি স্টারমারের সরে দাঁড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই সংখ্যা নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা শুরু করার জন্য যথেষ্ট বলেও মনে করা হচ্ছে। যদিও এখনো কোনো একক প্রার্থীকে ঘিরে ঐক্য গড়ে ওঠেনি, তবু পরিস্থিতি স্টারমারের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
মন্ত্রিসভায় সমর্থন, কিন্তু অস্বস্তি স্পষ্ট
ক্যাবিনেট বৈঠকের পর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী প্রকাশ্যে স্টারমারের পাশে দাঁড়ান। কর্মসংস্থানমন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার কাজ চালিয়ে যেতে চান এবং মন্ত্রিসভায় কেউ তাকে সরাসরি পদত্যাগের আহ্বান জানাননি। বিজ্ঞানমন্ত্রী লিজ কেন্ডালও পূর্ণ সমর্থনের কথা জানান।
তবে আড়ালে ভিন্ন চিত্রের কথাও উঠে এসেছে। সরকারি সূত্র দাবি করেছে, স্টারমার মন্ত্রিসভায় নির্বাচনী ফলাফল বা নিজের নেতৃত্ব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে রাজি হননি। এমনকি বৈঠকের পর তিনি মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করতেও অস্বীকৃতি জানান।
দলীয় বিদ্রোহ বাড়ছে
লেবার পার্টির ভেতরের বিদ্রোহ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। একাধিক এমপি বলেছেন, স্টারমার জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। লিডস সেন্ট্রাল অ্যান্ড হেডিংলির এমপি অ্যালেক্স সোবেল বলেন, জনগণ যদি মনে করে তাদের জীবন খারাপ হচ্ছে, তাহলে সেটি নীতিগত ব্যর্থতা। তার মতে, স্টারমারের সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের স্পষ্ট রূপরেখা দিতে পারেনি।
সাবেক নেতৃত্বপ্রার্থী রেবেকা লং-বেইলি প্রকাশ্যে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার দাবি তুলেছেন। তার ভাষায়, দলকে শান্ত ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব বেছে নিতে হবে।

প্রথম মন্ত্রী পদত্যাগ
সংকটের মধ্যে প্রথম মন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করেছেন মিয়াত্তা ফাহনবুল্লাহ। স্থানীয় সরকার, ধর্ম ও কমিউনিটিবিষয়ক এই জুনিয়র মন্ত্রী অভিযোগ করেন, সরকার যথেষ্ট দূরদর্শিতা দেখাতে পারেনি। তিনি শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সরকারের জনপ্রিয়তা কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
নতুন নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা
স্টারমারের বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে ইতোমধ্যে নানা নাম ঘুরছে। স্বাস্থ্যসচিব ওয়েস স্ট্রিটিংকে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন এমপি ইতোমধ্যে স্টারমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নামও আলোচনায় এসেছে। তার ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, তিনি ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
অর্থনীতিতেও প্রভাব
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে ব্রিটিশ অর্থনীতিতেও। স্টারমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে সরকারি ঋণের সুদের হার বেড়েছে। বিশেষ করে ১০ বছর ও ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা লর্ড রিকেটস সতর্ক করে বলেছেন, এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রিটেনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বর্তমান নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















