দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যাত্রা করা বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ ‘হন্ডিয়াস’-এ ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী হ্যান্টাভাইরাস নতুন করে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে এই প্রাদুর্ভাবে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং একাধিক দেশে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি ভাইরাস সংক্রমণের সংকট নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগিতা ও প্রস্তুতির ঘাটতিরও বড় সতর্কবার্তা।
হ্যান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরের মূত্র, বিষ্ঠা বা লালার সংস্পর্শ থেকে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথমে জ্বর, কাঁপুনি, পেশিতে ব্যথা ও পেটের সমস্যায় ভোগেন। পরে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়ে ফুসফুসে তরল জমা হতে পারে, যা শ্বাসপ্রশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিতেও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। এই ভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন এখনো নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ‘সিন নোমব্রে’ স্ট্রেইন সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে ‘হন্ডিয়াস’ জাহাজে শনাক্ত হওয়া ‘অ্যান্ডিস’ স্ট্রেইন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমিত হতে পারে। যদিও এ ধরনের সংক্রমণের জন্য দীর্ঘ সময় ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ প্রয়োজন হয়, তবু বহু দেশের যাত্রী একসঙ্গে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তদন্তে এখনো স্পষ্ট নয়, কীভাবে যাত্রীরা আক্রান্ত হয়েছেন। সম্ভাব্য তিনটি উৎস নিয়ে কাজ করছেন গবেষকরা। প্রথমত, একজন আক্রান্ত যাত্রী অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, জাহাজের ভেতরে কোনো ইঁদুরবাহিত উৎস থাকতে পারে। তৃতীয়ত, দক্ষিণ আমেরিকার কোনো স্থলভ্রমণের সময় যাত্রীরা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।
মৃতদের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের এক দম্পতি রয়েছেন। তাদের একজন আগে অসুস্থ হলেও দু’জনের উপসর্গ প্রায় কাছাকাছি সময়ে দেখা দেয়। ফলে একজন আরেকজনকে সংক্রমিত করেছেন, নাকি একই উৎস থেকে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রাদুর্ভাবটি ইতোমধ্যে একাধিক মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথম যাত্রী মারা যান জাহাজেই। পরে তার স্ত্রী সেন্ট হেলেনা হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছে মারা যান। এতে ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। পরে জাহাজে থাকা এক জার্মান নারীর মৃত্যু হয়। এছাড়া সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে একাধিক সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যান্টাভাইরাস সাধারণত কোভিড-১৯ বা হাম রোগের মতো বাতাসে সহজে ছড়ায় না। তবু দীর্ঘ ইনকিউবেশন পিরিয়ডের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দিতে এক সপ্তাহ থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে যাত্রীরা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরও নতুন সংক্রমণ ধরা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দ্রুত সংক্রমিত ব্যক্তিদের শনাক্ত, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ চালাতে হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য খাতে জনবল ও অর্থায়ন কমে যাওয়ায় অনেক দেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রাদুর্ভাব হয়তো সীমিত পর্যায়েই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ কোনো সংক্রমণ দেখা দিলে বৈশ্বিক প্রস্তুতির অভাব বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















