বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকায় চালু হয়েছে ‘জেন্ডার চ্যাম্পিয়নস নেটওয়ার্ক’ (জিসিএন)। সাজিদা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় গঠিত এই নেটওয়ার্ক উদ্বোধনের সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ট্রান্সফর্মিং ওয়ার্কপ্লেসেস: ড্রাইভিং ইকুইটি অ্যান্ড এমপাওয়ারিং অ্যাকশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নেটওয়ার্কটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এতে অংশ নেন ব্যবসায়ী, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ ও করপোরেট পেশাজীবীরা।
উদ্বোধনী আয়োজনে প্রকাশ করা হয় ‘জেন্ডার অ্যাট ওয়ার্ক: আ স্টাডি অব সিলেক্টেড প্রাইভেট সেক্টর ফার্মস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা। গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ও কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে।
গবেষণায় দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ শুরুতেই তুলনামূলক ভালো থাকলেও পদোন্নতির পথে তা দ্রুত কমে যায়। এন্ট্রি-লেভেল পদে নারীর উপস্থিতি ২২ শতাংশ হলেও মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় তা নেমে আসে মাত্র ৬ শতাংশে।
বেতন বৈষম্যের চিত্রও উঠে এসেছে গবেষণায়। সেখানে বলা হয়, পুরুষ কর্মীরা যেখানে প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে আয় করেন, নারীরা সেখানে পান ৮৫ টাকা। নেতৃত্ব পর্যায়ে এই বেতন বৈষম্য ৪০ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া প্রযুক্তিগত ও নেতৃত্ব উন্নয়ন প্রশিক্ষণে নারীদের সুযোগ তুলনামূলক কম বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নের কাজের কারণে নারীদের সামগ্রিক কাজের চাপও বেশি বলে গবেষণায় তুলে ধরা হয়।
ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ছিল কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ প্রতিনিধিত্ব, সমান বেতন, ন্যায়সঙ্গত নিয়োগ ও পদোন্নতি, ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও মেন্টরশিপ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি।
আলোচনায় উঠে এলো করপোরেট সংস্কারের প্রয়োজন
অনুষ্ঠানে আয়োজিত এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সাজিদা ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ অ্যাডভাইজর ড. সাজেদা আমিন, গেটস ফাউন্ডেশনের অনুপমা আনন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবিন, ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস খান, ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী নিহাদ কবির এবং সাজিদা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী জাহিদা ফিজ্জা কবির।
আলোচনায় রুহুল কুদ্দুস খান বলেন, লিঙ্গসমতা শুধু মানবসম্পদ বিভাগের বিষয় নয়, বরং এটি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারের অংশ হওয়া উচিত।
জাহিদা ফিজ্জা কবির বলেন, জেন্ডার ন্যায়বিচার একটি মৌলিক মানবাধিকার। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে এগোতে হবে।
গেটস ফাউন্ডেশনের অনুপমা আনন্দ বলেন, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী হলেও নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ মাত্র ৩৫ শতাংশ। এর পেছনে মূল কারণ নারীদের আকাঙ্ক্ষার অভাব নয়, বরং কাঠামোগত বাধা।
নতুন এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি বাস্তবায়নে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা হবে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। অংশীদারত্ব, প্রশিক্ষণ, নীতিগত সহায়তা ও পরামর্শের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়েই এই উদ্যোগ।
ইতোমধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডিং চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















