ভারতের সাম্প্রতিক কয়েকটি বিধানসভা নির্বাচনের ফল শুধু আঞ্চলিক ক্ষমতার পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত। একসময় যে বিজেপিকে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের সীমাবদ্ধ দল হিসেবে দেখা হতো, আজ তারা দেশের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই সাফল্যকে শুধুমাত্র ধর্মীয় মেরুকরণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের ফল বলে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলো আড়াল হয়ে যায়।
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপির উত্থানকে বোঝার জন্য শুধু নির্বাচনী পরিসংখ্যান দেখলে হবে না; দেখতে হবে তারা কীভাবে ভোটের ভাষা বদলে দিয়েছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার সময় বিজেপি ও তাদের মিত্ররা হাতে গোনা কয়েকটি রাজ্যে শাসন করত। এক দশকের মধ্যে সেই বিস্তার এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ভারতের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে তাদের সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতি, নেতৃত্বের স্পষ্টতা এবং স্থানীয় অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার কৌশল।
মোদির রাজনৈতিক পদ্ধতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে বাস্তব ক্ষোভকে নিয়ে আসা। গুজরাটে তার রাজনৈতিক উত্থানের শুরুর সময় থেকেই তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের নৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতাকে জনআলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। ভোটারদের কাছে তিনি আদর্শিক বিতর্কের চেয়ে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় অসন্তোষকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। এর ফলে ভোটের ভাষা আবেগ থেকে সরে গিয়ে ধীরে ধীরে কার্যকারিতা ও শাসনক্ষমতার প্রশ্নে দাঁড়িয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কয়েক বছর আগেও মনে করা হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান অটুট। কিন্তু বিজেপি বুঝতে পারে, শুধুমাত্র পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি দিয়ে সেখানে সাফল্য পাওয়া যাবে না। তারা প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জমি দখল, স্থানীয় দাদাগিরি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অসন্তোষের অভিযোগ। বহু সাধারণ মানুষ, যারা হয়তো আদর্শগতভাবে বিজেপির সমর্থক নন, তারাও স্থানীয় ক্ষোভের কারণে বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন।

ভারতের বহু রাজ্যে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যেখানে মানুষ রাজনৈতিক তত্ত্বের চেয়ে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। থানায় অভিযোগ নিতে অনীহা, স্থানীয় নেতাদের প্রভাব, দুর্নীতির সংস্কৃতি কিংবা দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ— এসব বিষয় ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। বিজেপি এই মনস্তত্ত্বকে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। তারা নিজেদের শুধু একটি মতাদর্শিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং ‘ব্যবস্থা বদলের’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।
তবে বিজেপির এই সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। বিহার, ওডিশা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে মানুষের প্রত্যাশা এখন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়; তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক দক্ষতার বাস্তব ফল চায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রচারণা শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে না পারলে সেই সমর্থন টেকসই হয় না।
অন্যদিকে বিরোধীদের সংকট আরও গভীর। বহু জায়গায় তারা এখনও পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা এবং আবেগনির্ভর প্রচারণার ওপর নির্ভর করছে। বিজেপিকে শুধু ‘বিপজ্জনক’ বা ‘বিভাজনমূলক’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরলেই যে ভোটারদের আস্থা ফেরানো যাবে না, পশ্চিমবঙ্গের ফল সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। এখনকার নির্বাচনে প্রয়োজন সুস্পষ্ট কৌশল, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো, মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা এবং এমন নেতৃত্ব, যারা মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে পারে।
ভারতের রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু আদর্শিক অবস্থান নয়, রাজনৈতিক কার্যকারিতাই মূল বিষয় হয়ে উঠছে। বিজেপি সেই পরিবর্তনের সুবিধা সবচেয়ে বেশি নিতে পেরেছে। বিরোধীরা যদি এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামী জাতীয় নির্বাচনগুলোতেও তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: শশী শেখর, সম্পাদক-ইন-চিফ, হিন্দুস্তান টাইমস
শশী শেখর 



















