একসময় ভিয়েতনামে বন্ধক ব্যবসা মানেই ছিল অন্ধকার ঘর, ভয়ভীতি আর অনিয়ন্ত্রিত লেনদেনের ধারণা। সেই খাতকে আধুনিক আর প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবায় রূপ দেওয়ার দাবি করছে দেশটির বৃহত্তম “নতুন প্রজন্মের” বন্ধক প্রতিষ্ঠান এফ৮৮। এখন প্রতিষ্ঠানটি দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার হো চি মিন স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এফ৮৮–এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ফুং আন তুয়ান জানান, প্রায় দুই দশক আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে নিজের সাইবার নিরাপত্তা স্টার্টআপের কর্মীদের বেতন দিতে হঠাৎ অর্থ সংকটে পড়েছিলেন তিনি। ব্যাংক থেকে দ্রুত ঋণ পাওয়ার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে একটি বন্ধক দোকানে যান। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাকে এই খাতে ব্যবসা শুরু করার অনুপ্রেরণা দেয়।
প্রথাগত বন্ধক ব্যবসার বাইরে নতুন মডেল
তুয়ানের ভাষায়, তখনকার বেশিরভাগ বন্ধক প্রতিষ্ঠান ছিল পরিবারভিত্তিক এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হতো। গ্রাহকদের সঙ্গে আচরণও ছিল নেতিবাচক। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, দ্রুত নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটাতে এই খাতের বাস্তব চাহিদা রয়েছে। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বন্ধক ব্যবসার মডেল নিয়ে গবেষণা করেন।
১৩ বছরে এফ৮৮ এখন ভিয়েতনামজুড়ে প্রায় ৯০০টির বেশি শাখা গড়ে তুলেছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কোম্পানিটির আয় ১০ গুণের বেশি বেড়ে ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডংয়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে নেট মুনাফাও রেকর্ড পর্যায়ে উঠে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডং হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ সেবা
এফ৮৮ মূলত মোটরসাইকেল ও গাড়ির কাগজপত্র বন্ধক রেখে ঋণ দেয়। ঋণের গড় মেয়াদ পাঁচ থেকে আট মাস। গ্রাহকরা যানবাহন ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারেন, শুধু নিবন্ধনপত্র বন্ধক রাখতে হয়। প্রতিষ্ঠানটি জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্ধক রাখা যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে।
ভিয়েতনামে বর্তমানে ৭ কোটির বেশি মোটরসাইকেল এবং ৫০ লাখের বেশি গাড়ি রয়েছে। তবুও এফ৮৮ এখনো মোট মোটরসাইকেল বাজারের দেড় শতাংশেরও কম গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সামনে বড় প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে বাজার বিশ্লেষকেরা।
বিতর্ক ও নিয়ন্ত্রক নজরদারি
তবে দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। ২০২৩ সালে ঋণ আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে এফ৮৮–এর কয়েকটি শাখা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। অভিযোগ ছিল, একজন কর্মী গ্রাহককে হুমকিমূলক বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যা চাঁদাবাজির শামিল বলে বিবেচিত হয়। পরে কোম্পানিটি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও ঋণ আদায়ের নীতিমালা আরও কঠোর করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের ভোক্তা ঋণ বাজারে এখনো বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে খুব দ্রুত সম্প্রসারণ হলে নিয়ন্ত্রকদের বাড়তি নজরদারির মুখে পড়তে পারে কোম্পানিটি। বর্তমানে এফ৮৮–এর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ডের শ্রীসাওয়াদ কর্পোরেশন, দক্ষিণ কোরিয়া সমর্থিত হ্যাপি মানি এবং জাপান-সংযুক্ত ডং শপ সান।
শেয়ারবাজারে বড় লক্ষ্য
এফ৮৮ ইতোমধ্যে ভিয়েতনামের ইউপিকম এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি মূল শেয়ারবাজার হোসে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোম্পানির লক্ষ্য, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আবারও ১ বিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্যে পৌঁছানো। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কোম্পানি শেয়ার বিভাজনের পরিকল্পনাও করছে।
তুয়ান জানান, আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল চ্যানেলে বড় বিনিয়োগ করবে এফ৮৮। ২০৩০ সালের মধ্যে অনলাইন সেবায় আরও প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডং বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তার মতে, ভিয়েতনামের বাজারে এখনো “অসংখ্য সম্ভাবনা” রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















