দীর্ঘদিন জাপানে বসবাস, উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং শরণার্থী মর্যাদা পাওয়ার পরও নাগরিকত্ব পেলেন না আফ্রিকার এক শরণার্থী। জাপানি ভাষায় লেখার দক্ষতা যথেষ্ট নয়—এই যুক্তিতে তার নাগরিকত্ব আবেদন খারিজের সরকারি সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে টোকিও জেলা আদালত। মঙ্গলবার দেওয়া এই রায় নতুন করে জাপানের নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতা ও কঠোরতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
চল্লিশোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি নিজ দেশে মানবাধিকার নির্যাতনের মুখে ২০১৩ সালে জাপানে আশ্রয় নেন। পরে ২০১৫ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী মর্যাদা পান। এরপর টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। তার লক্ষ্য ছিল জাতিসংঘে কাজ করা।
তবে জাপানি নাগরিকত্ব না থাকায় তিনি পাসপোর্ট পাননি। পরিবর্তে তাকে শরণার্থীদের জন্য দেওয়া ভ্রমণ নথির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এতে চাকরির আবেদন, বিদেশ ভ্রমণ এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সম্মেলনে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল ফোন ও ক্রেডিট কার্ডের চুক্তি করতেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হন তিনি।
দুই দফা আবেদন, তবু না
২০১৮ সালের মে এবং ২০২১ সালের জানুয়ারিতে তার নাগরিকত্ব আবেদন প্রত্যাখ্যান করে জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়। পরে ২০২৪ সালেও আরেকটি আবেদন নাকচ হয়। তবে আবেদন বাতিলের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তিনি আদালতে মামলা করেন এবং প্রায় ৩৩ লাখ ইয়েন ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। তার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, জাতিসংঘের শরণার্থী সনদের ৩৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত শরণার্থীদের নাগরিকত্ব অর্জন সহজ করা। কিন্তু জাপানের সিদ্ধান্ত সেই বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—নাগরিকত্ব পেতে জাপানি ভাষায় কতটা দক্ষতা প্রয়োজন। বিচার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় বলা আছে, আবেদনকারীর এমন ভাষাজ্ঞান থাকতে হবে যাতে তিনি “জাপানি সমাজে একীভূত হতে” পারেন।
রায়ে বিচারক ইউকিতো ওকাদা বলেন, আবেদনকারী দীর্ঘ নয় বছর জাপানে থাকার পরও মৌলিক হিরাগানা ও কাতাকানা ঠিকভাবে লিখতে পারছিলেন না। যদিও তার কথ্য জাপানি গ্রহণযোগ্য ছিল, লেখার দক্ষতা দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মানে পৌঁছায়নি বলে আদালত মনে করেছে।
বিচারক আরও বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় বিদেশিকে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে বিচারমন্ত্রীর নিজস্ব বিবেচনার ক্ষমতা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে বলা যাবে না।
‘ব্ল্যাক বক্স’ প্রক্রিয়ার অভিযোগ
বাদীপক্ষের আইনজীবী মাসাকো সুজুকি বলেন, জাপানি ভাষাজ্ঞান নাগরিকত্বের আইনি শর্ত হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। বরং সরকার “সমাজে একীভূত হওয়ার” ধারণাকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করছে।
তার ভাষায়, পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটাই “ব্ল্যাক বক্স”-এর মতো, যেখানে আবেদনকারীরা জানতেই পারেন না ঠিক কোন কারণে তাদের আবেদন বাতিল করা হচ্ছে।
এদিকে এই রায় এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জাপান নাগরিকত্বের শর্ত আরও কঠোর করছে। আগে পাঁচ বছরের বসবাস যথেষ্ট হলেও এখন সেটি ১০ বছরে উন্নীত করা হয়েছে, যা স্থায়ী বসবাসের শর্তের সমান।
বাদীপক্ষ জানিয়েছে, তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবে কি না, সে বিষয়ে আবেদনকারীর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















