০৩:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
চীনের জনসংখ্যা সংকট: আতঙ্কের আড়ালে অন্য এক বাস্তবতা স্টারমার সংকটে ব্রিটিশ রাজনীতির গভীর অসুখ ২৫ বছরের রেকর্ড ভাঙল হাম, দেশে আক্রান্ত ৫০ হাজার ছাড়াল ঢাকার শিশুদের দিনে প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে আসক্তি, বাড়ছে ঘুমের সমস্যা ও মানসিক ঝুঁকি জেলবন্দী  অবস্থায়  গুরুতর অসুস্থ হওয়া  আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক মন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রথম জানাজায় মানুষের ঢল  চট্টগ্রামে গুলিবিদ্ধ শিশু রেশমির মৃত্যু, আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু, বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের আলোচনা ওমানে রহস্যজনক মৃত্যু: চট্টগ্রামের চার প্রবাসী ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার মায়ের দুধ কম হওয়ার পেছনে মিলল নতুন কারণ, বদলাচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারণা ফিলিপাইনের রাজনীতিতে নতুন ঝড়, ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে অভিশংসন

শি-ট্রাম্প বৈঠক: কূটনৈতিক হাসির আড়ালে প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা

বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে যে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দেখা গেল, সেটি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল একটি কৌশলগত বার্তা। সামরিক কুচকাওয়াজ, ২১ বার তোপধ্বনি, শিশুদের উচ্ছ্বসিত অভিবাদন এবং ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যের প্রদর্শন—সব মিলিয়ে চীন বিশ্বকে বোঝাতে চাইল যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও স্থিতিশীল সম্পর্কের পথ খুঁজছে। কিন্তু এই উষ্ণতার নিচে যে গভীর অবিশ্বাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতার লড়াই জমাট বেঁধে আছে, তা আড়াল করার সুযোগ নেই।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠকের শুরুতেই যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটিই আসলে পুরো সফরের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সংজ্ঞায়িত করে। তিনি জানতে চেয়েছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি “থুসিডিডিস ফাঁদ” এড়াতে পারবে? অর্থাৎ, একটি উদীয়মান শক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তির মধ্যে সংঘর্ষ কি অনিবার্য? এই প্রশ্ন নতুন নয়, কিন্তু আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে চীন আর কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, সামরিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক প্রভাব—সব ক্ষেত্রেই বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও বুঝে গেছে যে চীনের উত্থান সাময়িক নয়। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল সহযোগিতা বা বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা, নির্ভরতা এবং কৌশলগত সতর্কতার এক জটিল মিশ্রণ।

US President Donald Trump shakes hands with Chinese President Xi Jinping upon arrival at the Great Hall of the People in Beijing on Thursday. Photo: Reuters

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সফরকে শুধুই সৌজন্য বিনিময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাণিজ্য। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের “সেরা” ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের তিনি সঙ্গে এনেছেন। এর মধ্যে স্পষ্ট একটি বার্তা রয়েছে—ওয়াশিংটনের কাছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনও অগ্রাধিকার, এমনকি রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত উত্থান নিয়েও উদ্বিগ্ন। ফলে সম্পর্কের ভেতরে একই সময়ে সহযোগিতা ও প্রতিরোধ—দুই প্রবণতাই কাজ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অতীত নীতিগুলোও দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা প্রকাশ্য প্রশংসা সবসময় কঠোর নীতিগত অবস্থানকে নরম করে না।

শি ও ট্রাম্পের পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রদর্শনও তাই এক ধরনের রাজনৈতিক নাটকীয়তা বহন করে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে শিকে “মহান নেতা” বলেছেন, আবার শিও ব্যক্তিগত উষ্ণতার মাধ্যমে সম্পর্কের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যক্তিগত রসায়ন কখনোই স্থায়ী সমাধান তৈরি করে না। রাষ্ট্রের স্বার্থ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এই সফরের আরেকটি তাৎপর্য হচ্ছে বৈশ্বিক দর্শকদের উদ্দেশে পাঠানো বার্তা। ইউরোপ, এশিয়া এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব—সবাই এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গতিপথের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ এই দুই দেশের সম্পর্ক কেবল তাদের নিজেদের অর্থনীতি বা নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে না; বরং বৈশ্বিক বাজার, প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা, সামরিক ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।

The Chinese and US delegations line up for talks in the the Great Hall of the People on Thursday. Photo: AP

চীন সম্ভবত দেখাতে চাইছে যে তারা আত্মবিশ্বাসী এবং বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের দাবিদার। আর ট্রাম্প বোঝাতে চাইছেন যে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি তিনি আলোচনার পথও খোলা রাখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা এত গভীর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাময়িক সৌহার্দ্য সেই মৌলিক দ্বন্দ্বকে মুছে দিতে পারবে না।

বরং এই বৈঠক আরও পরিষ্কার করে দিল যে আগামী বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক গল্পটি হবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক। প্রশ্ন শুধু এই নয় যে তারা সহযোগিতা করবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, তারা প্রতিযোগিতাকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, বড় শক্তিগুলোর ভুল হিসাব প্রায়ই বিশ্বকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

বেইজিংয়ের এই উষ্ণ অভ্যর্থনা তাই যতটা কূটনৈতিক সৌজন্যের, ততটাই শক্তির ভাষা। আর শি জিনপিংয়ের উত্থাপিত প্রশ্ন—সংঘাত এড়ানো সম্ভব কি না—সেটিই হয়তো আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের জনসংখ্যা সংকট: আতঙ্কের আড়ালে অন্য এক বাস্তবতা

শি-ট্রাম্প বৈঠক: কূটনৈতিক হাসির আড়ালে প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা

০২:০৫:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে যে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দেখা গেল, সেটি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল একটি কৌশলগত বার্তা। সামরিক কুচকাওয়াজ, ২১ বার তোপধ্বনি, শিশুদের উচ্ছ্বসিত অভিবাদন এবং ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যের প্রদর্শন—সব মিলিয়ে চীন বিশ্বকে বোঝাতে চাইল যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা ও স্থিতিশীল সম্পর্কের পথ খুঁজছে। কিন্তু এই উষ্ণতার নিচে যে গভীর অবিশ্বাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতার লড়াই জমাট বেঁধে আছে, তা আড়াল করার সুযোগ নেই।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠকের শুরুতেই যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটিই আসলে পুরো সফরের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সংজ্ঞায়িত করে। তিনি জানতে চেয়েছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি “থুসিডিডিস ফাঁদ” এড়াতে পারবে? অর্থাৎ, একটি উদীয়মান শক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠিত পরাশক্তির মধ্যে সংঘর্ষ কি অনিবার্য? এই প্রশ্ন নতুন নয়, কিন্তু আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে চীন আর কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়। প্রযুক্তি, বাণিজ্য, সামরিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক প্রভাব—সব ক্ষেত্রেই বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও বুঝে গেছে যে চীনের উত্থান সাময়িক নয়। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন আর কেবল সহযোগিতা বা বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা, নির্ভরতা এবং কৌশলগত সতর্কতার এক জটিল মিশ্রণ।

US President Donald Trump shakes hands with Chinese President Xi Jinping upon arrival at the Great Hall of the People in Beijing on Thursday. Photo: Reuters

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সফরকে শুধুই সৌজন্য বিনিময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাণিজ্য। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের “সেরা” ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের তিনি সঙ্গে এনেছেন। এর মধ্যে স্পষ্ট একটি বার্তা রয়েছে—ওয়াশিংটনের কাছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনও অগ্রাধিকার, এমনকি রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে চীনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত উত্থান নিয়েও উদ্বিগ্ন। ফলে সম্পর্কের ভেতরে একই সময়ে সহযোগিতা ও প্রতিরোধ—দুই প্রবণতাই কাজ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অতীত নীতিগুলোও দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা প্রকাশ্য প্রশংসা সবসময় কঠোর নীতিগত অবস্থানকে নরম করে না।

শি ও ট্রাম্পের পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রদর্শনও তাই এক ধরনের রাজনৈতিক নাটকীয়তা বহন করে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে শিকে “মহান নেতা” বলেছেন, আবার শিও ব্যক্তিগত উষ্ণতার মাধ্যমে সম্পর্কের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যক্তিগত রসায়ন কখনোই স্থায়ী সমাধান তৈরি করে না। রাষ্ট্রের স্বার্থ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এই সফরের আরেকটি তাৎপর্য হচ্ছে বৈশ্বিক দর্শকদের উদ্দেশে পাঠানো বার্তা। ইউরোপ, এশিয়া এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব—সবাই এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গতিপথের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ এই দুই দেশের সম্পর্ক কেবল তাদের নিজেদের অর্থনীতি বা নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে না; বরং বৈশ্বিক বাজার, প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা, সামরিক ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে।

The Chinese and US delegations line up for talks in the the Great Hall of the People on Thursday. Photo: AP

চীন সম্ভবত দেখাতে চাইছে যে তারা আত্মবিশ্বাসী এবং বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের দাবিদার। আর ট্রাম্প বোঝাতে চাইছেন যে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি তিনি আলোচনার পথও খোলা রাখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা এত গভীর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাময়িক সৌহার্দ্য সেই মৌলিক দ্বন্দ্বকে মুছে দিতে পারবে না।

বরং এই বৈঠক আরও পরিষ্কার করে দিল যে আগামী বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক গল্পটি হবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক। প্রশ্ন শুধু এই নয় যে তারা সহযোগিতা করবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, তারা প্রতিযোগিতাকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, বড় শক্তিগুলোর ভুল হিসাব প্রায়ই বিশ্বকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

বেইজিংয়ের এই উষ্ণ অভ্যর্থনা তাই যতটা কূটনৈতিক সৌজন্যের, ততটাই শক্তির ভাষা। আর শি জিনপিংয়ের উত্থাপিত প্রশ্ন—সংঘাত এড়ানো সম্ভব কি না—সেটিই হয়তো আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রশ্ন হয়ে থাকবে।