বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমাতে নতুন সম্ভাবনার কথা জানাল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণা। বাংলাদেশি গবেষক ফরহাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, ‘প্রোক্যালসিটোনিন’ভিত্তিক পরীক্ষা ব্যবহার করলে অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় প্রয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর এখন বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা দীর্ঘদিনের সমস্যা।
গবেষকদের মতে, সাধারণত রোগীর জন্য কোন অ্যান্টিবায়োটিক কতদিন প্রয়োজন তা নির্ধারণে মাইক্রোবায়োলজি পরীক্ষাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে রক্ত বা প্রস্রাবের নমুনায় ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। তবে বাংলাদেশের মতো দেশে উন্নতমানের ল্যাব সুবিধা সব হাসপাতালে সহজলভ্য নয়।
এ কারণে চিকিৎসকদের অনেক সময় জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। কিন্তু এই পদ্ধতিতে রোগীভেদে চিকিৎসার সময়সীমা পরিবর্তিত হয় না। ফলে অনেক রোগী প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেন।
নতুন পরীক্ষার কার্যকারিতা
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিফিল গবেষণার অংশ হিসেবে ফরহাদ চৌধুরী বিকল্প পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। তিনি ‘প্রোক্যালসিটোনিন’ নামের একটি জৈব উপাদানকে ব্যবহার করেন, যা শরীরে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ থাকলে বেড়ে যায় এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রক্তে প্রোক্যালসিটোনিনের মাত্রা নির্দিষ্ট নিরাপদ সীমার নিচে নেমে এলে বোঝা যায় রোগীর আর অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন নেই। ফলে এই পরীক্ষার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
ফরহাদ চৌধুরী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জৈবিক প্রয়োজন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা এএমআর বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। সীমিত সম্পদের দেশে প্রয়োজনীয় ল্যাব পরীক্ষা সবসময় সম্ভব না হওয়ায় তিনি এমন বিকল্প উপায় খুঁজতে চেয়েছেন যা বাস্তবসম্মত এবং সহজলভ্য।

চট্টগ্রামে পরিচালিত ট্রায়াল
২০২৩ সালে শুরু হওয়া ‘প্রোক্যালবান’ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০০-এর বেশি রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব রোগীর কারও সেপসিস নিশ্চিত ছিল, আবার কারও ক্ষেত্রে সেপসিসের আশঙ্কা ছিল।
রোগীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়। একদলের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা হয় প্রতিদিনের প্রোক্যালসিটোনিন পরীক্ষার ভিত্তিতে। অন্যদলকে চিকিৎসা দেওয়া হয় প্রচলিত জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোক্যালসিটোনিনভিত্তিক পরীক্ষার মাধ্যমে গড়ে প্রায় তিন দিন পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সময় কমানো সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই সময় কমানো এএমআর মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন দিগন্ত
গবেষণার অংশ হিসেবে ১২০টি ব্যাকটেরিয়ার নমুনা যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়েছে পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণের জন্য। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে এএমআরের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও সেপসিস পরিস্থিতি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।
গবেষণার ইতিবাচক ফলাফলের পর ফরহাদ চৌধুরী এখন বাংলাদেশে চিকিৎসকদের মধ্যে এই পরীক্ষাপদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কাজ করছেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি গবেষণার ফলাফল চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
তিনি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশে এএমআর কমাতে নতুন প্রযুক্তি ও পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে চান। পাশাপাশি এ বিষয়ে নতুন গবেষক তৈরির উদ্যোগও নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কমাতে অক্সফোর্ডের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















