দেশের প্রায় ২০ কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ভবিষ্যতের জনমিতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি এ নির্দেশনা দেন।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সর্বজনীন পেনশন স্কিমের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী। এতে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরুজ্জামান, অর্থসচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পেনশন স্কিমের বর্তমান অগ্রগতি
বৈঠকে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—এই চারটি স্কিমে মোট ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৫ জন নাগরিক নিবন্ধিত হয়েছেন।
এছাড়া পেনশন তহবিলে জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। মুনাফাসহ মোট বিনিয়োগের পরিমাণ পৌঁছেছে ২৭৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকায়।
অনানুষ্ঠানিক খাতকে গুরুত্ব
বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। ফলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
এছাড়া দেশের বয়স্ক নির্ভরশীলতার হার ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। ২০২৩ সালে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০৫০ সালে ২৪ শতাংশ এবং ২০৭৫ সালে ৪৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এ বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা ও অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তাকে এখন থেকেই গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন অংশগ্রহণকারীরা।
নতুন উদ্যোগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা
অর্থমন্ত্রী পেনশন কর্মসূচিকে আরও আকর্ষণীয় ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি শরিয়াভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। পাশাপাশি মনোনীত ব্যক্তির জন্য আজীবন পেনশন সুবিধা বিবেচনা এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের প্রগতি স্কিমের আওতায় আনার বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে একটি প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ১০ কোটি ডলার সহজ শর্তের ঋণ সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম চলছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন
বর্তমানে ৪৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পেনশন জমা গ্রহণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিকাশ, নগদ ও টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের মতো ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্মও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সারা দেশে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমেও নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে এই সেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।
সচেতনতা ও আস্থা বাড়ানোর তাগিদ
অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য পেনশন তহবিল গঠন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাগরিকদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি।
তিনি পেনশন ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বাড়াতে সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার, সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠক শেষে সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ সময় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে অর্থমন্ত্রী সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















