বিশ্বজুড়ে দাবানলের খবর একসময় ছিল মৌসুমি বিপর্যয়ের গল্প। এখন তা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙনের সংকেত হয়ে উঠছে। আফ্রিকা থেকে এশিয়া, বনভূমি থেকে তৃণভূমি—পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল এ বছর এমনভাবে আগুনে পুড়ছে, যা কেবল একটি দুর্যোগ নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুরতার প্রকাশ। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্ম যত এগিয়ে আসবে এবং এল নিনোর প্রভাব যত শক্তিশালী হবে, পরিস্থিতি তত ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
এ বছরের প্রথম চার মাসেই আগুনে পুড়ে গেছে ১৫ কোটি হেক্টরের বেশি জমি। আগের সব রেকর্ডকে পেছনে ফেলে এই সংখ্যা এখন নতুন আতঙ্কের প্রতীক। কিন্তু পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো আগুনের বিস্তার ও প্রকৃতি। কোথাও দীর্ঘ খরার পর শুকিয়ে যাওয়া বনভূমি আগুনের খাদ্যে পরিণত হয়েছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে জন্ম নেওয়া ঘাস পরে তীব্র গরমে শুকিয়ে গিয়ে বিশাল দাহ্য স্তর তৈরি করেছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন শুধু উষ্ণতা বাড়াচ্ছে না; এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দকেও ভেঙে দিচ্ছে।
আফ্রিকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কয়েক মাস আগেও যে অঞ্চলগুলোতে ভারী বৃষ্টি হয়েছিল, এখন সেখানেই তীব্র দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। প্রকৃতির এই চরম দোলাচল দেখাচ্ছে, জলবায়ু সংকট কেবল ‘গরম বেড়ে যাওয়া’ নয়; এটি আবহাওয়ার চরিত্র বদলে দেওয়ার প্রক্রিয়া। অতিরিক্ত বৃষ্টি ও দীর্ঘ খরার দ্রুত পালাবদল এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে আগুনের বিস্তার ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
এশিয়াতেও একই চিত্র। ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস ও চীনের বিস্তীর্ণ এলাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অঞ্চলগুলোর অনেক দেশ ইতিমধ্যেই চরম তাপপ্রবাহ, পানির সংকট এবং কৃষি উৎপাদনের চাপের মধ্যে রয়েছে। তার ওপর দাবানলের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠছে। বনভূমি ধ্বংস হওয়ার অর্থ শুধু গাছ হারানো নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য, কৃষিজমির স্থিতি এবং স্থানীয় অর্থনীতির নিরাপত্তা।

বিজ্ঞানীরা এখন সবচেয়ে বেশি শঙ্কা করছেন এল নিনোকে ঘিরে। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে তৈরি হওয়া এই আবহাওয়াগত ঘটনা অতীতেও বিশ্বের নানা অঞ্চলে খরা, বন্যা ও অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। কারণ এল নিনো এমন এক পৃথিবীতে ফিরে আসছে, যেখানে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক চক্র এখন আরও বিধ্বংসী হয়ে উঠছে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে।
এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যও একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। বহু বছর ধরে জলবায়ু সম্মেলন, প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক আলোচনার পরও বিশ্ব এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। উন্নত দেশগুলো নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ প্রায়ই ধীর এবং অপর্যাপ্ত। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সুরক্ষার দ্বৈত চাপে পড়ছে। ফলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
দাবানলের এই রেকর্ড কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাজনৈতিক ব্যর্থতারও দলিল। প্রতিটি আগুন আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরের ভবিষ্যৎ নয়। এটি এখনকার বাস্তবতা, যা খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে একসঙ্গে আঘাত করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড, দীর্ঘ খরা কিংবা বিধ্বংসী আগুন—সবকিছুই যেন নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ সংকটকে যখন অভ্যাসে পরিণত করা হয়, তখন প্রতিক্রিয়ার জরুরিতাও হারিয়ে যায়।
আগামী কয়েক মাস হয়তো আরও কঠিন হবে। কিন্তু এই সংকটের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু প্রকৃতির নয়; মানবসভ্যতারও। বিশ্ব কি এখনও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম, নাকি প্রতিটি নতুন দাবানল কেবল আমাদের ব্যর্থতার আরেকটি স্মারক হয়ে থাকবে?
লেখক: ডেভিড স্ট্যানওয়ে, আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক বিশ্লেষক।
ডেভিড স্ট্যানওয়ে 



















