১২:২৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
ইউরোভিশন ফাইনালে চমক, বিতর্ক আর উন্মাদনা: ভিয়েনায় জমে উঠেছে সংগীতের মহারণ মোদির কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক, সোনা কেনা ও বিদেশ ভ্রমণ কমাতে বলছে ভারত সরকার আদানি ও ভাতিজার বিরুদ্ধে মার্কিন জালিয়াতি মামলা নিষ্পত্তি, জরিমানা ১৮ মিলিয়ন ডলার ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে আবারও রক্তপাত, যুদ্ধবিরতি বাড়লেও থামছে না হামলা মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ভারতীয় হিপহপে ঝড় তুলছেন রেবল ট্রাম্পের সতর্কবার্তা: তাইওয়ান স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বাড়তে পারে চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা হিজাব নিয়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে বৈষম্যবিরোধী লড়াইয়ে হরমুজ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করছে না ইরান, আলোচনায় শর্ত দিল তেহরান রাউল কাস্ত্রোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগে কিউবায় নতুন উত্তেজনা ইন্দোনেশিয়ায় দুর্নীতির মামলায় আতঙ্ক, মেধাবীরা সরকারি দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী

ফ্রান্সে ‘বিদেশি’ শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা

  • Sarakhon Report
  • ১০:৪১:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
  • 5

নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার্থে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে স্নাতক পর্যায়ে বছরে দুই হাজার ৮৯৫ ইউরো (তিন হাজার ৩৯১ ডলার) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য বছরে তিন হাজার ৯৪১ ইউরো দিতে হবে

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-র বাইরের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আগের চেয়ে ১৬ গুণ বেশি ফি আদায়ের কথা ভাবছে ফরাসি সরকার৷ ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে এ পরিকল্পনা৷

গত মাসে ফ্রান্সে ‘চুজ ফ্রান্স ফর হাইয়ার এডুকেশন’ অর্থাৎ ‘উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্স বেছে নিন’ নামের এক প্রকল্প ঘোষণা করা হয়৷ এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের যে ছাড় দিয়ে আসছে, তা বাতিল করা৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে রাখার জন্যই মূলত এই ছাড় দেয়া হতো৷

নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার্থে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে স্নাতক পর্যায়ে বছরে দুই হাজার ৮৯৫ ইউরো (তিন হাজার ৩৯১ ডলার) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য বছরে তিন হাজার ৯৪১ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে৷ এর ফলে আগের তুলনায় ফি ১৬ গুণ বাড়বে৷ ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বছরে ২৫০ মিলিয়ন ইউরোর মতো অতিরিক্ত আয় হবে৷

ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ-দ্বার (প্রতীকী ছবি)

নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বছরে ২৫০ মিলিয়ন ইউরোর মতো অতিরিক্ত আয় হবে৷

ইউরোপীয় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং ফ্রান্সের ফেডারেশন অব জেনারেল স্টুডেন্টস এক বিবৃতিতে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বলেছে, ‘‘উচ্চশিক্ষায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে এই প্রস্তাব উদ্বেগজনক৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর মাধ্যমে ফরাসি সরকার এমন এক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে যার ফলে শিক্ষার সুযোগ ক্রমশ জাতীয়তা এবং আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হবে৷”

শিক্ষা সবার জন্য সহজলভ্য হওয়া উচিত – দীর্ঘদিন ধরে এ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে আসছে ফ্রান্স৷ তবে তুলোঁ স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান গোলিয়ার মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকায় এবং শিক্ষার্থীদের নিজের দেশের বাইরেও বিভিন্ন কোর্স বেছে নেওয়ার সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে৷

নৈতিকতা বনাম অর্থ

চলতি সপ্তাহে লন্ডনের কিংস কলেজ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক নিবন্ধে এই যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘সরকারি অর্থের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে টিউশনমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার মানে হলো শিক্ষক ও গবেষকদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন দেয়ার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়টিই নস্যাৎ করে দেওয়া৷ কজনই বা জানেন যে,  আজকের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষায় দশ বছর এবং স্নাতকোত্তর-পরবর্তী গবেষণায় ( পোস্ট-ডক) আরো কয়েক বছর কাটানো তরুণ কোনো প্রভাষক বছরে মাত্র ৩০ হাজার ইউরোর মতো বেতন পান৷ অথচ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মেধাবীদের নিয়োগ করার ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি বেতন অফার করতে সক্ষম৷”

প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম (প্রতীকী ছবি)

‘‘সরকারি অর্থের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে টিউশনমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার মানে হলো শিক্ষক ও গবেষকদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন দেয়ার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়টিই নস্যাৎ করে দেওয়া৷ কজনই বা জানেন যে,  আজকের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষায় দশ বছর এবং স্নাতকোত্তর-পরবর্তী গবেষণায় ( পোস্ট-ডক) আরো কয়েক বছর কাটানো তরুণ কোনো প্রভাষক বছরে মাত্র ৩০ হাজার ইউরোর মতো বেতন পান৷ অথচ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মেধাবীদের নিয়োগ করার ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি বেতন অফার করতে সক্ষম৷”

অবশ্য শুধু যে ফ্রান্সই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং এ কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিষয়টি এভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে, তা নয়৷

ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশের মতো নেদারল্যান্ডসেও ইইউভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক পর্যায়ে বছরে দুই হাজার ৫০০ ইউরো দিতে হয়, কিন্তু বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনার বিষয়ভেদে এই খরচ ১৩ হাজার থেকে ৩২ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে৷

লন্ডনের কিংস কলেজের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্নাতক শেষ করার এক বছর পরও ৫৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নেদারল্যান্ডসেই থেকে যান৷ তবে ৫ বছর পর এই সংখ্যা কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে আসে৷

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইইউভুক্ত অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা বেশি৷

এ কারণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ডাচ সরকার৷ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইংরেজির পরিবর্তে ডাচ ভাষায় পাঠদান করা হয় এমন কোর্সের সংখ্যা বাড়ানো এবং নতুন করে কোনো ইংরেজি ভাষার কোর্স চালু না করা৷ এই নীতির ফলে চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০২৫-২৬) নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে৷

স্পেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম৷ করোনার সময়ের প্রতীকী ফাইল ফটো৷

স্প্যানিশ ভাষার ব্যাপক প্রচলনের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্পেন৷ শিক্ষা খাতের বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইসিইএফ মনিটর -এর তথ্য অনুযায়ী,  ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে স্পেন আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ১০ হাজারেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিয়েছে

ইউরোপে যুক্তরাজ্যের বড় সুবিধা

ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্য৷ দীর্ঘ দিন ধরে তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে৷ ১৯৮১ সালে, অর্থাৎ ৪৫ বছর আগেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ফি নির্ধারণের প্রথা চালু করেছিল তারা৷ ইংরেজি যেহেতু বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ভাষা, তাই যুক্তরাজ্য এবং ইংরেজি মাতৃভাষা – এমন অন্যান্য দেশও অনেক দিন ধরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে৷

ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যে ইইউভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও ইউরোপের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থী আকর্ষণে ইংল্যান্ড এখনো ইউরোপের মধ্যে সামনের সারিতেই রয়েছে৷ অর্থনৈতিক বিষয়ের পরামর্শক ‘লন্ডন ইকোনমিকস’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগমনের ফলে যুক্তরাজ্যের নিট লাভ দাঁড়িয়েছে ৪৩ বিলিয়ন ইউরো৷

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর ২৩ শতাংশই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী৷ তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা কিছুটা কমছে৷ সেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বার্ষিক শিক্ষা ফি ৪৪ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে৷ অন্যদিকে একই ফি ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের বেলায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৩০০ ইউরো৷ যুক্তরাজ্যের কোন অঞ্চলে পড়াশোনা করছেন এবং কোন বিষয়ে পড়ছেন তার ওপর ভিত্তি করে ফি কম-বেশি হয়৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নে অভিন্ন নীতি নেই

স্প্যানিশ ভাষার ব্যাপক প্রচলনের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্পেন৷ শিক্ষা খাতের বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইসিইএফ মনিটর -এর তথ্য অনুযায়ী,  ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে স্পেন আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ১০ হাজারেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিয়েছে৷ স্পেনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক ডিগ্রির খরচ দুই হাজার ১০০ ইউরো থেকে পাঁচ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে৷ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই তুলনায় কিছুটা বেশি৷

স্পেনের প্রতিবেশী দেশ পর্তুগালেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বেশ বাড়ছে৷ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেখানে ২০১৫ সালে যেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৪২ হাজারে পৌঁছায়৷ পর্তুগালেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাধারণত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি ফি দিতে হয়৷ সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের স্নাতক ডিগ্রির বার্ষিক ফি বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ ইউরোর মতো৷ অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বেলায় তা দুই হাজার ৫০০ ইউরো বা তারও বেশি৷

প্রতীকী ফাইল ফটো

জার্মানিতে শিক্ষার খরচ সাধারণভাবে অনেক কম৷ জার্মানির অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রতি সেমিস্টারে টিউশন ফি বাবদ নামমাত্র ২০০ থেকে ৫০০ ইউরো নিয়ে থাকে৷ তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ফি সেই তুলনায় বেশি৷

তবে জার্মানিতে তুলনায় অনেক কম খরচে ডিগ্রি অর্জন করা যায়৷ অস্ট্রিয়া, ক্রোয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড, গ্রিস এবং সুইডেনসহ ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের সাশ্রয়ী বা বিনা খরচে পড়াশোনারও সুযোগ দেয়৷ তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি-র ক্ষেত্রে দেশভেদে ব্যাপক তারতম্য দেখা যায়৷

ডিডাব্লিউ ডটকম

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউরোভিশন ফাইনালে চমক, বিতর্ক আর উন্মাদনা: ভিয়েনায় জমে উঠেছে সংগীতের মহারণ

ফ্রান্সে ‘বিদেশি’ শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা

১০:৪১:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-র বাইরের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আগের চেয়ে ১৬ গুণ বেশি ফি আদায়ের কথা ভাবছে ফরাসি সরকার৷ ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে এ পরিকল্পনা৷

গত মাসে ফ্রান্সে ‘চুজ ফ্রান্স ফর হাইয়ার এডুকেশন’ অর্থাৎ ‘উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্স বেছে নিন’ নামের এক প্রকল্প ঘোষণা করা হয়৷ এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের যে ছাড় দিয়ে আসছে, তা বাতিল করা৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে রাখার জন্যই মূলত এই ছাড় দেয়া হতো৷

নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার্থে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে স্নাতক পর্যায়ে বছরে দুই হাজার ৮৯৫ ইউরো (তিন হাজার ৩৯১ ডলার) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য বছরে তিন হাজার ৯৪১ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে৷ এর ফলে আগের তুলনায় ফি ১৬ গুণ বাড়বে৷ ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বছরে ২৫০ মিলিয়ন ইউরোর মতো অতিরিক্ত আয় হবে৷

ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ-দ্বার (প্রতীকী ছবি)

নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বছরে ২৫০ মিলিয়ন ইউরোর মতো অতিরিক্ত আয় হবে৷

ইউরোপীয় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং ফ্রান্সের ফেডারেশন অব জেনারেল স্টুডেন্টস এক বিবৃতিতে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বলেছে, ‘‘উচ্চশিক্ষায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের ক্ষেত্রে এই প্রস্তাব উদ্বেগজনক৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর মাধ্যমে ফরাসি সরকার এমন এক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে যার ফলে শিক্ষার সুযোগ ক্রমশ জাতীয়তা এবং আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হবে৷”

শিক্ষা সবার জন্য সহজলভ্য হওয়া উচিত – দীর্ঘদিন ধরে এ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে আসছে ফ্রান্স৷ তবে তুলোঁ স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান গোলিয়ার মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকায় এবং শিক্ষার্থীদের নিজের দেশের বাইরেও বিভিন্ন কোর্স বেছে নেওয়ার সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে৷

নৈতিকতা বনাম অর্থ

চলতি সপ্তাহে লন্ডনের কিংস কলেজ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক নিবন্ধে এই যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘সরকারি অর্থের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে টিউশনমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার মানে হলো শিক্ষক ও গবেষকদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন দেয়ার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়টিই নস্যাৎ করে দেওয়া৷ কজনই বা জানেন যে,  আজকের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষায় দশ বছর এবং স্নাতকোত্তর-পরবর্তী গবেষণায় ( পোস্ট-ডক) আরো কয়েক বছর কাটানো তরুণ কোনো প্রভাষক বছরে মাত্র ৩০ হাজার ইউরোর মতো বেতন পান৷ অথচ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মেধাবীদের নিয়োগ করার ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি বেতন অফার করতে সক্ষম৷”

প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম (প্রতীকী ছবি)

‘‘সরকারি অর্থের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে টিউশনমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার মানে হলো শিক্ষক ও গবেষকদের প্রতিযোগিতামূলক বেতন দেয়ার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়টিই নস্যাৎ করে দেওয়া৷ কজনই বা জানেন যে,  আজকের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষায় দশ বছর এবং স্নাতকোত্তর-পরবর্তী গবেষণায় ( পোস্ট-ডক) আরো কয়েক বছর কাটানো তরুণ কোনো প্রভাষক বছরে মাত্র ৩০ হাজার ইউরোর মতো বেতন পান৷ অথচ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মেধাবীদের নিয়োগ করার ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি বেতন অফার করতে সক্ষম৷”

অবশ্য শুধু যে ফ্রান্সই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং এ কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিষয়টি এভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে, তা নয়৷

ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশের মতো নেদারল্যান্ডসেও ইইউভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক পর্যায়ে বছরে দুই হাজার ৫০০ ইউরো দিতে হয়, কিন্তু বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনার বিষয়ভেদে এই খরচ ১৩ হাজার থেকে ৩২ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে৷

লন্ডনের কিংস কলেজের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, স্নাতক শেষ করার এক বছর পরও ৫৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নেদারল্যান্ডসেই থেকে যান৷ তবে ৫ বছর পর এই সংখ্যা কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নেমে আসে৷

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইইউভুক্ত অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা বেশি৷

এ কারণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ডাচ সরকার৷ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইংরেজির পরিবর্তে ডাচ ভাষায় পাঠদান করা হয় এমন কোর্সের সংখ্যা বাড়ানো এবং নতুন করে কোনো ইংরেজি ভাষার কোর্স চালু না করা৷ এই নীতির ফলে চলতি শিক্ষাবর্ষে (২০২৫-২৬) নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে৷

স্পেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম৷ করোনার সময়ের প্রতীকী ফাইল ফটো৷

স্প্যানিশ ভাষার ব্যাপক প্রচলনের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্পেন৷ শিক্ষা খাতের বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইসিইএফ মনিটর -এর তথ্য অনুযায়ী,  ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে স্পেন আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ১০ হাজারেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিয়েছে

ইউরোপে যুক্তরাজ্যের বড় সুবিধা

ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্য৷ দীর্ঘ দিন ধরে তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে৷ ১৯৮১ সালে, অর্থাৎ ৪৫ বছর আগেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ফি নির্ধারণের প্রথা চালু করেছিল তারা৷ ইংরেজি যেহেতু বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ভাষা, তাই যুক্তরাজ্য এবং ইংরেজি মাতৃভাষা – এমন অন্যান্য দেশও অনেক দিন ধরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে৷

ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্যে ইইউভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও ইউরোপের বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থী আকর্ষণে ইংল্যান্ড এখনো ইউরোপের মধ্যে সামনের সারিতেই রয়েছে৷ অর্থনৈতিক বিষয়ের পরামর্শক ‘লন্ডন ইকোনমিকস’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগমনের ফলে যুক্তরাজ্যের নিট লাভ দাঁড়িয়েছে ৪৩ বিলিয়ন ইউরো৷

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থীর ২৩ শতাংশই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী৷ তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা কিছুটা কমছে৷ সেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বার্ষিক শিক্ষা ফি ৪৪ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে৷ অন্যদিকে একই ফি ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের বেলায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৩০০ ইউরো৷ যুক্তরাজ্যের কোন অঞ্চলে পড়াশোনা করছেন এবং কোন বিষয়ে পড়ছেন তার ওপর ভিত্তি করে ফি কম-বেশি হয়৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নে অভিন্ন নীতি নেই

স্প্যানিশ ভাষার ব্যাপক প্রচলনের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে স্পেন৷ শিক্ষা খাতের বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান আইসিইএফ মনিটর -এর তথ্য অনুযায়ী,  ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে স্পেন আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ১০ হাজারেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীকে সুযোগ দিয়েছে৷ স্পেনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক ডিগ্রির খরচ দুই হাজার ১০০ ইউরো থেকে পাঁচ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে৷ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই তুলনায় কিছুটা বেশি৷

স্পেনের প্রতিবেশী দেশ পর্তুগালেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বেশ বাড়ছে৷ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেখানে ২০১৫ সালে যেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৪২ হাজারে পৌঁছায়৷ পর্তুগালেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাধারণত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি ফি দিতে হয়৷ সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের স্নাতক ডিগ্রির বার্ষিক ফি বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ ইউরোর মতো৷ অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বেলায় তা দুই হাজার ৫০০ ইউরো বা তারও বেশি৷

প্রতীকী ফাইল ফটো

জার্মানিতে শিক্ষার খরচ সাধারণভাবে অনেক কম৷ জার্মানির অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রতি সেমিস্টারে টিউশন ফি বাবদ নামমাত্র ২০০ থেকে ৫০০ ইউরো নিয়ে থাকে৷ তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ফি সেই তুলনায় বেশি৷

তবে জার্মানিতে তুলনায় অনেক কম খরচে ডিগ্রি অর্জন করা যায়৷ অস্ট্রিয়া, ক্রোয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড, গ্রিস এবং সুইডেনসহ ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিক্ষার্থীদের সাশ্রয়ী বা বিনা খরচে পড়াশোনারও সুযোগ দেয়৷ তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি-র ক্ষেত্রে দেশভেদে ব্যাপক তারতম্য দেখা যায়৷

ডিডাব্লিউ ডটকম