তিন ব্যক্তি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বাউলশিল্পীকে জোর করে ধরে তাঁর চুল-দাড়ি কেটে দিচ্ছেন। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকগুলোর হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বাউলশিল্পী।
শেষ পর্যন্ত অসহায় কণ্ঠে শুধু বলেন, ‘আল্লাহ, তুই দেহিস।’
২০২৫ সালে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজারে এ ঘটনা ঘটে। এই বাউলশিল্পীর নাম হালিম উদ্দিন আকন্দ (৭০)। উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি।

ক্ষমতায় থাকাকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা কখনোই মব ঠেকাতে নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নেননি। তবে গত ৫ এপ্রিল বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘মব ঠেকানোর ক্ষেত্রে দৃঢ়তা দেখাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’
বাউলশিল্পী ও সংগঠক রাজু সরকার বলেন, ইউনূসের আমলে সারা দেশে বাউল-ফকিররা অপদস্থ, হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এ সময় তাঁরা তেমন কোনো অনুষ্ঠানেও যেতে পারেননি, গান গাইতে পারেননি। সারা দেশেই বাউলশিল্পীরা ভয় ও আতঙ্কে ছিলেন।
মঞ্চনাটক, গ্রাম থিয়েটারকর্মীরা আক্রান্ত
স্বাধীনতার পর আধুনিক নাট্য-আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’ উপহার দিয়েছে কালজয়ী নাটক ও অনেক শিল্পী-কলাকুশলী।
দেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে আরেক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, নির্দেশক, সংগঠক মামুনুর রশীদও হেনস্তার শিকার হন। ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার সামনে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের এক অনুষ্ঠানে হামলা করে দুর্বৃত্তরা।

মামুনুর রশীদ বলেন, ‘শিল্পকলার সাবেক ডিজি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন, আমি যাতে শিল্পকলায় অভিনয় না করি। কারণ হিসেবে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সময় দেওয়া ২৪ জন বিশিষ্টজনের একটি বিবৃতির কথা জানান। রাজাকার স্লোগান নিয়ে ২৪ জন বিশিষ্টজন বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেখানে আমার নাম ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ওই বিবৃতিতে কী অপরাধ আছে? অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে একটি মহল বিভিন্নভাবে চষ্টা করেছিল দেশে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হয়ে যাক।’
রুপালি পর্দার তারকারাও আক্রান্ত
চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় মুখ নুসরাত ফারিয়া। বাংলাদেশ ও ভারতে একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। পেয়েছেন খ্যাতি ও ব্যাপক পরিচিতি। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীনির্ভর ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’ চলচ্চিত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নুসরাত ফারিয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হত্যা মামলার আসামি করা হয় এই অভিনেত্রীকে। ২০২৫ সালের ১৮ মে গ্রেপ্তার হন ফারিয়া।

টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে পরিচিত মুখ কমেডি অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বিকেলে কাকরাইল এলাকায় মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। সংগৃহীত ভিডিওতে দেখা যায়, জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে একদল যুবক। কেউ একজন তাঁর গায়ে হাত তুলছিল। জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে সিদ্দিককে সেদিন রমনা থানা-পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
চারুকলা শিল্পীদের হেনস্তা
২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের এক অনুষ্ঠানে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন প্রখ্যাত শিল্পী ও ‘টোকাই’ চরিত্রের স্রষ্টা রফিকুন নবী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তাঁর ওপর মব হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আয়োজকরা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনাটি চারুকলা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

২০২৫ সালের ৫ মে গুলশানে ভাস্কর রাসাকে রিকশা থেকে নামিয়ে গালাগাল ও হেনস্তা করা হয়।
সূত্র জানায়, সেদিন সন্ধ্যায় ভাস্কর রাসা রিকশায় করে গুলশানের সাজু আর্ট গ্যালারিতে যাচ্ছিলেন। গুলশান-১ ও গুলশান-২-এর মাঝামাঝি এলাকায় এক যুবক তারা রিকশা থামিয়ে তর্কে জড়ান। পরে আরো দুই-তিনজন সেখানে জড়ো হয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে ভাস্কর রাসা দ্রুত রাস্তা পার হয়ে সেখান থেকে সরে যান। তখন পেছন থেকে তাঁকে আঘাত করা হয় বলেও জানা গেছে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নেতারাও আক্রান্ত
দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রায় দেড় শ সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই জোটের অধিকাংশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে হত্যা কিংবা হত্যাচষ্টোর মামলা রয়েছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে মব হামলার শিকার হয়েছেন। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ অনেক দিন ধরেই আত্মগোপনে আছেন। সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ মব আক্রমণ ও মামলা থেকে রক্ষা পেতে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
কথাশিল্পীরাও হামলা–মামলার শিকার
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পরই ৭ মার্চ ও ১৫ আগস্ট সরকারি ছুটি বাতিল করে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ক্রিয়েটিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠন মানববন্ধন আয়োজন করে। সেখানে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় অর্ধশত কবি-সাহিত্যিক ও লিটলম্যাগ কর্মী। সেদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁদের ওপর আক্রমণ চালায় কয়েক শ মানুষ। দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা দিয়ে তাঁদের প্রায় সবাইকে বেদম প্রহার করা হয়।

কারা হামলা করেছে
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সারা দেশে বাউল, লোকশিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনাগুলোর পেছনে একই ধরনের সংগঠিত চক্রের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিলেছে। অধিকাংশ হামলাকারী ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানার ব্যবহার করে মাঠে নামে। তবে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাজার ভাঙ্গার ঘটনাগুলো কেন ঘটছে
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মাজার ভাঙ্গার ঘটনা ঘটছে। মাজারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ঘিরে মানুষজন আহতও হয়েছে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইভেন্ট খুলেও মাজার ভাঙ্গার আহ্বান জানানো হচ্ছে।


সূত্রঃ কালের কণ্ঠ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















