ফিলিপাইনের রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতার্তের অভিশংসনকে কেন্দ্র করে। দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে অভিশংসন অনুমোদনের পর রাজধানী ম্যানিলাজুড়ে শুরু হয়েছে নাটকীয় রাজনৈতিক সংঘাত, যার প্রভাব এখন ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত গড়ানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফের্দিনান্দ “বংবং” মার্কোস এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট সারা দুতার্তের রাজনৈতিক জোট একসময় ছিল ফিলিপাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী সমীকরণ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই পরিবারের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এখন সেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে ক্ষমতার লড়াইয়ে।
রাজনৈতিক দুই পরিবারের সংঘর্ষ
সারা দুতার্তে হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের মেয়ে। তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্ডানাও অঞ্চলে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মার্কোসও দেশের আরেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক বংশের প্রতিনিধি।
২০২২ সালের নির্বাচনে দুই পরিবারের জোট বিশাল বিজয় এনে দিলেও পরে তাদের সম্পর্ক চরম তিক্ততায় পৌঁছে। এখন মার্কোসপন্থীরা অভিশংসনের মাধ্যমে দুতার্তে পরিবারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দুর্বল করতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে দুর্নীতি
সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে দুর্নীতি ও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন। দেশটির অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা জানিয়েছে, তার ও তার স্বামীর ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে অন্তত ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ফিলিপাইন পেসোর সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এর আগে ২০২৪ সালে এক বক্তব্যে সারা দুতার্তে দাবি করেছিলেন, তার ক্ষতি হলে প্রেসিডেন্ট মার্কোস, তার স্ত্রী এবং পার্লামেন্টের স্পিকারকে হত্যার জন্য তিনি একজন ঘাতক ঠিক করে রেখেছেন। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটিই তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে দুর্বল অভিযোগ।
সেনেটে নাটকীয় পরিস্থিতি
অভিশংসনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে দেশটির সিনেটে। দুতার্তে-সমর্থক সিনেটররা নতুন সিনেট প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেন। এরপর সাবেক পুলিশ প্রধান রোনাল্ড “বাতো” দেলা রোসাকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়।
দেলা রোসা সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানের অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন। ওই অভিযানে হাজারো মানুষ নিহত হয়। বর্তমানে রদ্রিগো দুতার্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
এর মধ্যেই সিনেট ভবনের ভেতরে গুলির শব্দ শোনা যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুতার্তেপন্থী সিনেটররা দাবি করেন, সরকারি বাহিনী তাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তবে প্রেসিডেন্ট মার্কোস টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে এমন কোনো অভিযান পরিচালনার কথা অস্বীকার করেন।
ঘটনার পর অনেকেই ধারণা করছেন, এটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক নাটক হতে পারে। কারণ গুলির উৎস এবং লক্ষ্য এখনো স্পষ্ট হয়নি।
বিচারের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে রাজনীতি
বিশ্লেষকদের মতে, সারা দুতার্তের বিরুদ্ধে সিনেটের বিচার মূলত রাজনৈতিক শক্তি পরীক্ষায় পরিণত হবে। তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। কিন্তু সেই সমর্থন আদৌ মিলবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
সিনেটের অনেক সদস্য নিজেরাও দুর্নীতির অভিযোগে চাপে আছেন। ফলে রাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য তারা দুতার্তের পাশে দাঁড়াতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে দুতার্তে-বিরোধীরা মনে করছেন, দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেলে জনমত তার বিপক্ষে চলে যাবে। সে কারণেই বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ফিলিপাইনের ভবিষ্যৎ কোন পথে
বর্তমান পরিস্থিতি ফিলিপাইনের রাজনীতিকে দুই ভিন্ন পথে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট মার্কোস নিজেকে আইনভিত্তিক শাসনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তিনি তার পরিবারের অতীতের বিতর্কিত ভাবমূর্তি বদলাতে আগ্রহী।
অন্যদিকে সারা দুতার্তের রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে উঠেছে কঠোরতা, প্রতিশোধ এবং শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতিকে ঘিরে। ফলে আগামী কয়েক বছরে দেশটির রাজনীতি আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















