একসময় মধ্য আমেরিকায় আইনের শাসনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল গুয়াতেমালা। দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অভিযানে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের পর্যন্ত কারাগারে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সেই আশার আলো কয়েক বছরের মধ্যেই ম্লান হয়ে যায়। এবার নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের আগমনে আবারও পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছে দেশটির মানুষ।
দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের উত্থান ও পতন
এক দশক আগে গুয়াতেমালা সিটির মারিসকাল জাভালা কারাগার ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বড় প্রতীক। জাতিসংঘ-সমর্থিত দুর্নীতিবিরোধী কমিশন উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করার পর দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনের চাপেই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট অটো পেরেজ মোলিনা।
সেই সময় বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন আশা তৈরি হয়েছিল। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জিমি মোরালেস দুর্নীতির অভিযোগে নিজেও চাপে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সেই কমিশনকে দেশ থেকে বের করে দেন। পরে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল মারিয়া কনসুয়েলো পোরাস দুর্নীতিবিরোধী বহু মামলা দুর্বল করে দেন এবং বিচারক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলকে ঘিরে প্রত্যাশা
দীর্ঘ বিতর্কের পর এবার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া লুনা। তাঁকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনচেতা ও শান্ত স্বভাবের কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর নিয়োগকে প্রেসিডেন্ট বার্নার্দো আরেভালোর জন্য বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণেই আরেভালো নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কাজটি মোটেও সহজ হবে না। বিচারব্যবস্থার ভেতরে এখনও আগের ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব রয়ে গেছে। ফলে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রতিবাদ, মামলা ও রাজনৈতিক চাপ
২০২৩ সালের নির্বাচনের পর আরেভালোর ক্ষমতা গ্রহণ ঠেকাতে নানা চেষ্টা চালানো হয়েছিল। ভোটকেন্দ্রে অভিযান চালানো, নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ তোলা এবং আদালতের ওপর চাপ তৈরির মতো ঘটনায় দেশজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় আদিবাসী নেতাদের নেতৃত্বে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। পরে সেই আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়।
এই ঘটনাগুলো গুয়াতেমালার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের দাবি, অন্যদিকে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিরোধ—দুইয়ের সংঘাতে দেশটি এখনও অস্থির।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ও সম্ভাবনা
নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ অপরাধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও চাপ থাকবে। অনেকেই আশা করছেন, তিনি ধীরে ধীরে বিচারব্যবস্থায় সংস্কার আনবেন।
তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন আগের মতো নেই বলেও উদ্বেগ রয়েছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দিলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক চাপ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট আরেভালো যদি স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতের সংস্কার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
গুয়াতেমালায় নতুন অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব গ্রহণ ঘিরে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে নতুন আশার আলো দেখছে সাধারণ মানুষ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















