চীন এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে নতুন প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার যেমন দেশটিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তেমনি বাড়িয়ে দিচ্ছে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের উদ্বেগও। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বচালিত গাড়ির মতো প্রযুক্তি নিয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকেরা এক ধরনের ভারসাম্য খুঁজছেন—কতটা স্বাধীনতা দিলে উদ্ভাবন বাড়বে, আর কতটা নিয়ন্ত্রণ দিলে ঝুঁকি কমবে।
সম্প্রতি বেইজিংয়ে নিরাপত্তাজনিত কারণে ড্রোন বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে ড্রোন প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ব্যবসা শহরের বাইরে হেবেই প্রদেশে সরতে শুরু করেছে। তবে সেখানে গিয়েও পুরোপুরি স্বাধীনতা মিলছে না। প্রতিদিন উড়ানের অনুমতি নিতে হচ্ছে, নির্দিষ্ট উচ্চতার বাইরে ড্রোন ওড়ানো যাচ্ছে না এবং প্রশিক্ষণার্থীদের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হচ্ছে।
প্রযুক্তি নিয়ে দ্বিমুখী অবস্থান
চীনের প্রযুক্তি নীতিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই দুই ধরনের ধারণা প্রচলিত। একদিকে বলা হয়, দেশটির তুলনামূলক শিথিল নিয়ম ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নতুন প্রযুক্তি বিকাশে সহায়ক। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির বাড়তি প্রভাব ঠেকাতে সরকার প্রায়ই কঠোর হস্তক্ষেপ করে।
চীনা কর্মকর্তারা এ অবস্থানকে ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেন “অন্তর্ভুক্তিমূলক সতর্কতা” ধারণা। অর্থাৎ নতুন উদ্ভাবনের জন্য দরজা খোলা রাখা হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। কিন্তু বাস্তবে এই ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
স্বচালিত গাড়িতে বাড়ছে কড়াকড়ি
স্বচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে চীনকে বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী দেশ হিসেবে ধরা হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন ও প্রয়োজনীয় সেন্সর তৈরিতে দেশটি এগিয়ে রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনার পর সরকার নতুন বিধিনিষেধ আনছে।
আগামী বছর কার্যকর হতে যাওয়া নতুন খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, চালক সতর্কবার্তার জবাব না দিলে স্বচালিত গাড়িকে নিরাপদভাবে থেমে যেতে হবে। এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের উদ্বেগও বাড়ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তিতেও সতর্ক চীন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একসময় ধারণা ছিল, বিশ্ব নেতৃত্ব ধরে রাখতে চীন যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। কিন্তু সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্প্রতি একটি আদালত রায় দিয়েছে, শুধুমাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কর্মী ছাঁটাই করা যাবে না। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার ওপরও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। সরকার জানিয়েছে, এসব ব্যবস্থার জন্য মানব তদারকি বাধ্যতামূলক করা হবে এবং জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হবে।
পুরোনো সমস্যার নতুন রূপ
চীনের শিক্ষাবিদেরা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের এই জটিলতা ব্যাখ্যা করতে “কলিংরিজ দ্বিধা” নামের একটি ধারণার কথা বলছেন। এই ধারণা অনুযায়ী, প্রযুক্তি যখন নতুন থাকে তখন তার ভবিষ্যৎ প্রভাব বোঝা কঠিন হয়, ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণও সম্ভব হয় না। আবার প্রযুক্তি যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে যায়।
চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এখন এই বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে অনেকে আশা করছেন, পরিষ্কার নীতিমালা তৈরি হলে ভবিষ্যতে শহরের আকাশে পণ্য পরিবহন ও যাত্রী পরিবহনেও ড্রোন ব্যবহার বাড়বে। তবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়লে কঠোর নিয়ন্ত্রণও আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে চীনের কর্মকর্তারাও এখনো নিশ্চিত নন। উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের এই দ্বন্দ্ব শুধু চীনের নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















