বিশ্ব রাজনীতির গত এক দশকের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি ছিল—আমেরিকার আধিপত্য কি শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর তার জায়গা কি নিতে চলেছে চীন? বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক বিস্তারের ধারাবাহিক অগ্রগতির কারণে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন একবিংশ শতাব্দী হবে “চীনের শতাব্দী”। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা সেই সরল সমীকরণকে জটিল করে তুলছে। চীন এখনও শক্তিশালী, এখনও প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু তার উত্থানের গতি কি এখন চূড়ায় পৌঁছে ধীর হয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন এখন আর শুধু পশ্চিমা বিশ্লেষকদের নয়, বরং বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র নানা সংকটে দুর্বল ও বিভ্রান্ত বলে মনে হয়েছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, নেতৃত্বের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক জোটে ফাটল এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপ ওয়াশিংটনের অবস্থানকে অনিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে তুলনামূলক স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। উৎপাদন খাতে তার আধিপত্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি, জাহাজ নির্মাণ থেকে ড্রোন উৎপাদন পর্যন্ত শিল্প সক্ষমতা—সব মিলিয়ে চীনকে এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়েছে, যাকে আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তুলনা করাও যথেষ্ট নয়।
বিশেষ করে শিল্পভিত্তিক ক্ষমতার জায়গায় চীনের অগ্রগতি স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র এখনও উদ্ভাবনে এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তব উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের শক্তি এখন অনেক বেশি গভীর। আধুনিক যুদ্ধ, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির বাস্তব জগৎ শেষ পর্যন্ত শুধু সফটওয়্যার দিয়ে চলে না; চলে কারখানা, যন্ত্রপাতি, রোবট, জাহাজ ও সরবরাহ শৃঙ্খল দিয়ে। এই জায়গাতেই বেইজিং গত দুই দশকে এমন ভিত্তি তৈরি করেছে, যা আমেরিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবু শক্তির এই ছবির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর দুর্বলতা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসছে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ যে বৈশ্বিক প্রভাব বলয় তৈরি করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তার অনেক প্রকল্প এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়। ঋণ, রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং স্থানীয় সংকটের কারণে বহু দেশে চীনের প্রভাব প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আশঙ্কার তুলনায় বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে।
কিন্তু অর্থনীতির চেয়েও বড় সংকেত এসেছে জনসংখ্যা থেকে। চীনের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন হয়তো তার জন্মহার। একসময় এক-সন্তান নীতির মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে যে রাষ্ট্র গর্ব করত, আজ সেই রাষ্ট্রই নতুন প্রজন্মকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করেও ব্যর্থ হচ্ছে। জন্মহার এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
এটি কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের প্রশ্নও। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিয়ে ও পরিবার গঠনের আগ্রহ দ্রুত কমে যাওয়া দেখাচ্ছে যে উন্নয়ন ও আধুনিকতার মাঝেও সমাজের গভীরে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক, যদি মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী না হয়, তাহলে সেই শক্তির ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।
চীনের বর্তমান নেতৃত্ব হয়তো মনে করে সময় তাদের পক্ষেই আছে। তারা হয়তো বিশ্বাস করে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে এবং আমেরিকার রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা শেষ পর্যন্ত তাকে দুর্বল করবে। কিন্তু যদি বেইজিং একই সঙ্গে উপলব্ধি করে যে তাদের নিজস্ব শক্তিও স্থায়ী নয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। ইতিহাসে অনেক উদীয়মান শক্তিই এমন মুহূর্তে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যখন তারা অনুভব করেছে তাদের সেরা সময় সীমিত।

তাই তাইওয়ান প্রশ্ন এখন শুধু আঞ্চলিক বিরোধ নয়; এটি সময়ের বিরুদ্ধে এক কৌশলগত হিসাব। যদি চীন বিশ্বাস করে যে ভবিষ্যতে তার জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতি আরও দুর্বল হবে, তাহলে বর্তমান সময়কে তারা হয়তো নিজেদের “সেরা সুযোগ” হিসেবে দেখতে পারে। আর সেখানেই বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, যদি চীনা নেতৃত্ব এখনও নিশ্চিত থাকে যে আমেরিকার পতন অনিবার্য এবং সময় শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই যাবে, তাহলে হয়তো সংঘর্ষ এড়ানোর সম্ভাবনাও বাড়বে। কারণ আত্মবিশ্বাসী শক্তি অপেক্ষা করতে পারে; অনিশ্চিত শক্তি অপেক্ষা করতে চায় না।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি আর শুধু “চীন উঠছে কি না” নয়। বরং প্রশ্ন হলো—চীনের উত্থান কি ইতোমধ্যে তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে? হয়তো আগামী দুই দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতি এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে। কারণ ইতিহাসে প্রতিটি পরাশক্তির মতো চীনের ভবিষ্যৎও কেবল সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে তার সমাজ কতটা টেকসই, তার মানুষ কতটা ভবিষ্যৎমুখী, এবং তার নেতৃত্ব কতটা ধৈর্যশীল।
রস ডাউথাট 



















