কয়েক দশক ধরে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ব আমাদের এক ধরনের নিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প শুনিয়েছে। বলা হয়েছে, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, গণিত আর কোডিং-ই হবে আগামী পৃথিবীর একমাত্র কার্যকর ভাষা। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস কিংবা শিল্পকলাকে দেখানো হয়েছে প্রায় অলস বিলাসিতা হিসেবে—যে জ্ঞান চাকরি দেয় না, উৎপাদন বাড়ায় না, বাজার তৈরি করে না। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উত্থান সেই আত্মবিশ্বাসী বয়ানকে এখন অদ্ভুতভাবে উল্টে দিচ্ছে।
যে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন মানবিক বিদ্যাকে অপ্রয়োজনীয় বলে পাশ কাটিয়েছে, তারাই এখন বলছে—মানুষকে বোঝার ক্ষমতা, আবেগ, কল্পনা, নৈতিক বিচার এবং সহানুভূতির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই পরিবর্তন নিছক বৌদ্ধিক উপলব্ধি, নাকি প্রযুক্তি খাতের এক ধরনের দেরিতে আসা অপরাধবোধ—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রোগ্রামিং, বিশ্লেষণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ কিংবা বহু করপোরেট কাজ মানুষের চেয়ে দ্রুত এবং সস্তায় সম্পন্ন করা সম্ভব। যে তরুণেরা কয়েক বছর আগেও কম্পিউটার বিজ্ঞানে ভর্তি হওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, তারা এখন বুঝতে শুরু করেছে—কোড লেখার কাজও হয়তো স্থায়ী নিরাপত্তা দিচ্ছে না। প্রযুক্তি নিজেরাই সেই দক্ষতাকে স্বয়ংক্রিয় করে ফেলছে, যেটিকে এতদিন ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল।
এই বাস্তবতা প্রযুক্তি দুনিয়াকে এক অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে। মানুষকে যদি যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেই হয়, তাহলে মানুষের বিশেষত্ব কোথায়? তথ্য মুখস্থ করা নয়, দ্রুত হিসাব করাও নয়। বরং মানুষের বিশেষত্ব হয়তো অনিশ্চয়তা বোঝার ক্ষমতায়, নৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হওয়ার সাহসে, অথবা এমন প্রশ্ন করার অভ্যাসে যার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই।
এ কারণেই এখন প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা “ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স”, “স্টোরিটেলিং”, “কৌতূহল” কিংবা “সহানুভূতি”র মতো শব্দ ব্যবহার করছেন। তারা উপলব্ধি করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতার গভীরতা অনুভব করতে পারে না। একটি অ্যালগরিদম হয়তো শেক্সপিয়ারের নাটকের সারাংশ লিখতে পারবে, কিন্তু হ্যামলেটের দ্বিধা বা কামুর অস্তিত্ব সংকটের মানসিক চাপ অনুভব করতে পারবে না।
এখানেই মানবিক বিদ্যার মৌলিক শক্তি। সাহিত্য, দর্শন কিংবা শিল্পকলা মানুষের ভেতরের অন্ধকার, অনিশ্চয়তা এবং সৌন্দর্যের জটিল সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে। এগুলো কোনো “সঠিক উত্তর” দেয় না; বরং প্রশ্নের সঙ্গে বাঁচতে শেখায়। প্রযুক্তি যেখানে দ্রুত সমাধান চায়, মানবিক শিক্ষা সেখানে ধৈর্য শেখায়। প্রযুক্তি যেখানে দক্ষতা মাপে, শিল্প সেখানে অর্থের সন্ধান করে।

তবু এই নতুন প্রশংসার ভেতরে ভণ্ডামির গন্ধও রয়েছে। কারণ একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানবিক বিভাগের বাজেট কমছে, সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে, পাঠাভ্যাস দুর্বল হচ্ছে। যে সমাজ এতদিন বাজারমূল্য ছাড়া অন্য কোনো জ্ঞানের মূল্য দিতে চায়নি, সেই সমাজ এখন হঠাৎ করে মানবিকতার প্রয়োজনীয়তা আবিষ্কার করছে—কারণ প্রযুক্তি তাদের নিজেদের অস্তিত্বকেই অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এখানে একটি সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের দিকও রয়েছে। ডিজিটাল যুগ মানুষের মনোযোগকে খণ্ডিত করেছে। দীর্ঘ লেখা পড়ার ধৈর্য কমেছে, গভীর মনোযোগের জায়গা দখল করেছে ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া। জন্মদিনের চিঠি থেকে ফোন, ফোন থেকে টেক্সট, আর এখন ইমোজিতে নেমে আসা যোগাযোগের ইতিহাস কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি মানবিক সম্পর্কের সংকোচনের ইতিহাসও। মানুষ যেন ধীরে ধীরে অনুভূতির ভাষা হারাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে যারা এখনো কঠিন বই পড়ে, দীর্ঘ লেখা লেখে বা জটিল চিন্তার সঙ্গে লড়াই করে, তারা এক ধরনের বিরল মানসিক সক্ষমতা ধরে রাখছে। কারণ গভীর চিন্তা একটি অনুশীলন; এটি দ্রুত স্ক্রল করে অর্জন করা যায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো তথ্য সরবরাহ করবে, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সহনশীলতা তৈরি করবে না।
প্রযুক্তি নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তাই দ্বৈততা স্পষ্ট। একদিকে তারা বলছেন, ভবিষ্যতে মানবিক গুণাবলি সবচেয়ে মূল্যবান হবে। অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিই এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে মানুষের মনোযোগ, ধৈর্য এবং কল্পনাশক্তি ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। তারা এখন মানবিক বিদ্যার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছেন, কিন্তু প্রযুক্তি শিল্পের ব্যবসায়িক মডেল দীর্ঘদিন ধরে সেই মানবিকতাকেই দুর্বল করেছে।
প্রশ্ন হলো, এই পুনর্মূল্যায়ন কি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থা বা সমাজকে বদলাবে? নাকি এটি কেবল প্রযুক্তি খাতের নতুন ভাষা, যা তাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষকে নরম করতে ব্যবহার করা হচ্ছে?
কারণ প্রযুক্তি শিল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু নতুন যন্ত্র তৈরি করা নয়; তারা মানুষের জ্ঞানবোধকেই বদলে দিয়েছে। তথ্যকে জ্ঞানের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেন বোতাম চাপলেই উত্তর পাওয়া মানেই বোঝাপড়া অর্জন করা। অথচ জ্ঞান সবসময় ধীর, জটিল এবং অসম্পূর্ণ। এর ভেতরে রহস্য আছে, দ্বিধা আছে, নৈতিক অস্বস্তি আছে। মানবিক বিদ্যার শক্তি এখানেই—এটি মানুষকে কেবল দক্ষ কর্মী বানায় না, বরং মানুষ হিসেবে বাঁচার জটিলতাও শেখায়।
সম্ভবত এ কারণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষ আবার কবিতা, দর্শন কিংবা সাহিত্যের দিকে তাকাচ্ছে। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলো বদলায় না: জীবনের অর্থ কী, ভালোবাসা কী, ভয় কোথা থেকে আসে, অথবা আমরা কেন সৌন্দর্যের প্রয়োজন অনুভব করি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো এসব প্রশ্নের ভাষাগত উত্তর তৈরি করতে পারবে। কিন্তু সেই প্রশ্নগুলোর ভার বহন করার ক্ষমতা এখনো মানুষেরই।
মওরিন ডাউড 



















