সারাক্ষণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, নীতির দোলাচল আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে একসময় যে প্রশ্নটি শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য মনে হতো, এখন তা পশ্চিমা অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে: নিজের দেশের বাজারে কতটা ভরসা করা যায়? বিনিয়োগের জগতে এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, বরং ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বাস্তব হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হয়। আর সেই হিসাব বলছে, কেবল দেশীয় বাজারে আটকে থাকলে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে।
এক সময় বিদেশে বিনিয়োগ ছিল জটিল, ব্যয়বহুল এবং অনেকের নাগালের বাইরে। এখন প্রযুক্তি সেই বাধা সরিয়ে দিয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বৈশ্বিক ফান্ডের মাধ্যমে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিনিয়োগ করা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবু বহু বিনিয়োগকারী এখনও নিজেদের সঞ্চয়ের বড় অংশ দেশীয় অর্থনীতিতেই আটকে রাখছেন। বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ব্রিটেনের অংশ এখন খুবই সামান্য। অথচ অনেক বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওতে দেশীয় শেয়ারের অনুপাত সেই বাস্তবতার তুলনায় বহু গুণ বেশি।
এটি শুধু বিনিয়োগের কৌশলগত দুর্বলতা নয়, বরং মানসিক অভ্যাসেরও প্রতিফলন। মানুষ পরিচিত জায়গায় নিরাপত্তা খোঁজে। কিন্তু অর্থনীতির ইতিহাস বলে, পরিচিত বাজারও দ্রুত অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পুঁজির বৈশ্বিক প্রবাহ এখন এমনভাবে কাজ করছে যে পুরোনো শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিগুলো আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ নয়।
বিশ্বের বৃহত্তম করপোরেশনগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় ক্ষমতার কেন্দ্র কত দ্রুত বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো আজ বৈশ্বিক বাজারকে প্রভাবিত করছে, আর এশিয়ার কিছু কোম্পানি সেই আধিপত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই পরিবর্তনের ভেতরে দাঁড়িয়ে শুধু দেশীয় বাজারে সীমাবদ্ধ থাকা মানে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির বড় অংশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা।
তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মানেই অন্ধ ঝুঁকি নেওয়া নয়। বরং বিচক্ষণ বিনিয়োগের মূল দর্শনই হলো বৈচিত্র্য। বিভিন্ন দেশ, মুদ্রা ও শিল্পখাতে সম্পদ ছড়িয়ে দিলে কোনো একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ধাক্কা পুরো পোর্টফোলিওকে ধ্বংস করতে পারে না। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে একসময়ের শক্তিশালী রাষ্ট্রও ঋণ, মুদ্রাস্ফীতি বা রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারিয়েছে।

ব্রিটেনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও সেই আশঙ্কাকে নতুন করে সামনে এনেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অস্থিরতা, করনীতি নিয়ে বিভ্রান্তি এবং সরকারি ঋণের চাপ বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সরকারি বন্ডের ফলন বেড়েছে, অর্থাৎ ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা যখন কোনো অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, তখন সেই আস্থাহীনতা দ্রুত আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখন এমন কথাও মূলধারার রাজনীতিতে শোনা যাচ্ছে যা একসময় কেবল অস্থিতিশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। ঋণবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সম্পত্তির মালিকানা কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা পেনশন তহবিলকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ঠেলে দেওয়ার মতো ধারণা বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ বাজার শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতায় আস্থা রাখে।
তবে এর মানে এই নয় যে দেশীয় অর্থনীতিতে আর কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং সংকটের মধ্যেও অনেক প্রতিষ্ঠান অসাধারণ সাফল্য দেখায়। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা মহাকাশভিত্তিক শিল্পে ব্রিটেনের কিছু কোম্পানি সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অর্থাৎ সমস্যাটা পুরো দেশের নয়; সমস্যাটা একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার।
বিনিয়োগে আবেগের জায়গা খুব সীমিত। “দেশপ্রেমের কারণে দেশীয় শেয়ার কিনতে হবে” — এই ধারণা আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। একজন বিনিয়োগকারীর প্রথম দায়িত্ব নিজের সম্পদ রক্ষা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য বাড়ানো। যদি সেই সুযোগ বিদেশি বাজারে বেশি থাকে, তবে সেখানে যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ঝুঁকিও বৈশ্বিক, সম্ভাবনাও বৈশ্বিক। কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক নাটক বা অর্থনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত যেন একজন মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয়কে বিপন্ন না করতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত আধুনিক বিনিয়োগ কৌশলের মূল ভিত্তি। আর সেই কারণেই আজকের পৃথিবীতে বিচ্ছিন্ন জাতীয়তাবাদী বিনিয়োগের চেয়ে আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্য অনেক বেশি বাস্তবসম্মত পথ।
ইয়ান কাউই 



















