কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যয়। এক সময় যেসব প্রতিষ্ঠান বিপুল নগদ অর্থ তৈরি করত, এখন তারাই বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করছে নতুন ডেটা সেন্টার, চিপ এবং এআই অবকাঠামো গড়তে। ফলে লাভ বাড়লেও কমে যাচ্ছে হাতে থাকা নগদ অর্থের প্রবাহ।
অ্যামাজন, গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও ওরাকলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এখন এমন এক প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যেখানে টিকে থাকতে হলে লাগাতার বিনিয়োগ করতেই হবে। বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরে এই পাঁচ প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে শুধুমাত্র এআই সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য।
লাভ বাড়ছে, নগদ কমছে
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা এখনো বাড়ছে। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে নগদ অর্থের প্রবাহে। কারণ, ডেটা সেন্টার নির্মাণ, উন্নত চিপ কেনা এবং এআই মডেল চালানোর জন্য যেসব অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, তার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

এই ব্যয় সরাসরি লাভের হিসাবে পুরোপুরি ধরা না পড়লেও নগদ প্রবাহে তার বড় প্রভাব পড়ছে। ফলে অনেক কোম্পানি এখন এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, যেখানে বছরের কিছু সময়ে তাদের নগদ প্রবাহ নেতিবাচক হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি খাতের এই পরিস্থিতি অনেকটা নব্বইয়ের দশকের ডটকম যুগ বা শেল গ্যাস বিপ্লবের সময়কার অতিরিক্ত বিনিয়োগের মতো। তবে এবার পার্থক্য হলো, পুরো বিষয়টি আবর্তিত হচ্ছে এআইকে ঘিরে।
এআই অবকাঠামোয় অস্বাভাবিক ব্যয়
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু নিজেদের জন্য নয়, পুরো এআই শিল্পের ভিত্তি তৈরি করছে। তারা বিশাল ডেটা সেন্টার বানাচ্ছে, হাজার হাজার উন্নতমানের চিপ কিনছে এবং দীর্ঘমেয়াদি কম্পিউটিং চুক্তিতে যাচ্ছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ আয় নির্ভর করছে এমন সব চুক্তির ওপর, যেগুলোর মাধ্যমে এআই মডেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম্পিউটিং সুবিধা দেওয়া হবে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এসব সেবার বড় গ্রাহক হয়ে উঠছে।

তবে এই মডেল নির্মাতা কোম্পানিগুলোর অনেকেই এখনো লাভজনক নয়। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি অনেকাংশে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ঋণ বাড়ছে প্রযুক্তি জায়ান্টদের
এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে। গত বছরের শুরু থেকে তারা শত শত বিলিয়ন ডলার বন্ড বিক্রি করেছে। শুধু ডেটা সেন্টার নির্মাণ নয়, ভবিষ্যতের ভাড়াভিত্তিক অবকাঠামো এবং সরঞ্জাম কেনার জন্যও বিশাল আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আর্থিক কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে। আগে যেসব প্রতিষ্ঠান কম ঋণ ও বেশি নগদ অর্থের জন্য পরিচিত ছিল, এখন তারাই বড় অঙ্কের দেনার মধ্যে প্রবেশ করছে।
চিপ কোম্পানিগুলোর সোনালি সময়
এআই বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। ডেটা সেন্টারের জন্য উন্নত প্রসেসর ও মেমোরি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর আয় দ্রুত বাড়ছে।

এনভিডিয়া, ব্রডকম, মাইক্রন ও স্যান্ডিস্কের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রযুক্তি খাতের নতুন শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যয় সরাসরি তাদের আয় ও মুনাফা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝুঁকিও বাড়ছে
যদিও এআই নিয়ে বাজারে প্রবল আশাবাদ রয়েছে, তবু ঝুঁকির কথাও সামনে আসছে। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো যে গতিতে ব্যয় করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।
যদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত হারে এআই সেবার জন্য অর্থ খরচ না করে, তাহলে এই বিপুল বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তবুও আপাতত বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো থামার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে তারা আরও বড় বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















